বিজয় বার্তা ২৪ ডট কম
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার মাসদাইর কবরস্থান ও শ্বশান। এখানে ৪ টি ধর্মের অনুসারীদের দাফন ও শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়। চারটি ধর্মের এই পবিত্র স্থান পৃথিবীর ইতিহাসে সত্যিই বিরল। কবরস্থান ও শ্মশানের জন্য বিশাল এ ভূমি দান করে গেছেন শ্রী হরকান্ত ব্যানার্জী, পরবর্তীতে সময়ের প্রয়ােজনে এর আয়তন বৃদ্ধি করা হয়েছে। যার রক্ষনাবেক্ষনে দায়িত্বে রয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন। বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বন্ধনের আরেক নাম নারায়ণগঞ্জ। যেখানে হিন্দু, মুসলিম খিষ্ট্রান ও বৌদ্ধ ভ্রাতৃত্বপূর্নভাবে বসবাস করেন। সম্প্রতি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বন্ধনের জেলা নারায়ণগঞ্জে কবরস্থানে শ্বশানের পোরামাটি ফেলাকে নিয়ে তৈরি হয়েছে এক কলংকের অধ্যায়। গত ৯ আগষ্ট নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি শামীম ওসমান তার বাবা মায়ের কবর জিয়ারত করতে গিয়ে দেখে কবর ও তার আশেপাশে ফেলা হয়েছে শ্বশানের পোরামাটি। এ খবর শুনে তাৎক্ষনিক গনমাধ্যমকর্মী সহ কবর থাকা পরিবারের লোকজন ঘটনাস্থলে ছুটে আসে। এই কবরস্থানে রয়েছে ভাষাসৈনিক, বীরমুক্তিযোদ্ধা সহ খ্যাতিম্যান ব্যক্তিদের কবর। এই কবরগুলো সচেতন মহলের মতে সংরক্ষিত হিসেবে রাখা হয়। সাথে তাদের কবরগুলোতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হয়েছে কবরস্থানে। স্থানীয় ঠিকাদার ও কবরস্থানে দায়িত্বে থাকা ইমাম মোয়াজ্জিনের কাছে এমপি শামীম ওসমান ঘটনার কারন জানতে চান। এবং দ্রুত সমস্যা সমাধানের অনুরোধ জানান।
এসময় সবার সামনে কবরস্থানের সীমানা প্রাচীর ও উন্নয়ন কাজের ঠিকাদার মামুন জানান, এটা উচিত হয়নি। আমি মাটিগুলো বাইরের সড়কে রেখেছিলাম। কিছু বৃষ্টিতে আসার কথা তবে এটা তারা ভরাট করে চলাচলের জন্য তৈরী করেছে আর কিছু তারাই ভরেছে। জসিম নামে একজন আছে আমি চিনিনা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কবরস্থান মসজিদের ইমাম বদরশাহ জানান, কবরস্থানে শ্মশানের মাটি দেয়া সমীচীন নয়। এখানে ধর্মীয় বিষয় না তবে এটা মানবিক দিক থেকেই উচিত নয়। আমি মসজিদে নামাজ পড়াই ও দোয়া করি। এ বিষয়টি আমি দেখভাল করিনা। তবে নাপাক মাটি কবরে দেয়া উচিত হয়নি।
মসজিদের মোয়াজ্জিন ও কবরস্থানের দেখভালের দায়িত্বে থাকা জাকারিয়া জানান, এটা শ্মশানের মাটি। ঠিকাদাররা শ্মশান ও কবরস্থানের উন্নয়ন কাজ করেছে। এটা ঠিক হয়নি।
সাংবাদিকদের এমপি শামীম ওসমান বলেন, নারায়ণগঞ্জ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জেলা। তাই কবরস্থানে শ্মশানের মাটি ফেলে এই সম্প্রীতি নষ্ট করার অপচেষ্টা করা হচ্ছে। আমি মনে করি এটা কোন মানুষের কাজ না, এটা ইবলিশের কাজ। ‘যারা এ কাজটা করেছেন বা করিয়েছেন তাদের কাছে আমার একটাই জিজ্ঞাসা, কী লাভ হল এটা করে। আমারা বাবা মা ভাই মারা যাওয়ার পর আমার যেমন কষ্ট হয়েছিল আজকে তার চেয়ে কোন অংশে কম কষ্ট হচ্ছে না।’ তিনি বলেন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতসহ মুক্তিযোদ্ধাদের এভাবে অবমাননার বিচার সরকার করবে। তবে এমন ঘৃণিত কাজের পরেও সিটি কর্পোরেশনের কোন কর্মকর্তা কবরস্থানে না আসায় শামীম ওসমান তাদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এমপি আরো বলেন, সিটি করপোরেশন কাজ না করলেও আমরা কাজ করছি। এখানে অধিকাংশ আমাদের শ্রমিক। ঠিকাদারও কাজ করেছেন। পরে এ ঘটনার পর কবরের উপর ফেলা শ্মশানের মাটি সরিয়ে নেয়ার কাজ করা হয়। এদিকে কবরস্থান পরিদর্শন শেষে বাবা-মা ও বড় ভাইয়ের কবরে গিলাপ পড়িয়ে তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে দোয়াও করেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমান।
এদিকে ওইদিন বিকেলে এক বিবৃত্তিতে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেন, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম শামীম ওসমান তাঁর পিতা মাতাসহ স্বজনদের কবর জিয়ারত করে যে অভিযোগ করেন শ্মশানের মাটি দিয়ে কবর ঢেকে দেয়া হয়েছে। প্রকৃত সত্য শামীম ওসমান স্বজনদের কবরে মাটি ফেলা হয়নি। তাঁর বড় ভাই প্রয়াত সাংসদ নাসিম ওসমানের কবর অপেক্ষাকৃত নিচু হওয়ায় পানি জমার আশংকায় পারভীন ওসমান (নাসিম ওসমানের স্ত্রী) তাদের আত্মীয় নাসিরের মাধ্যমে মাটি ফেলে। এখানে সিটি করপোরেশনের নিযুক্ত কেয়ারটেকার তাকে সহায়তা করেছে মাত্র। এ সত্যকে আড়াল করে সংসদ সদস্য সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের হীন উদ্দেশ্যে এ অভিযোগ ও বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন।
মেয়র আইভীর বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে এ ঘটনায় খোদ পারভীন ওসমান প্রশ্ন রেখে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আপনারাই বলেন,আমার স্বামী বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ৩ বারের এমপি নাসিম ওসমান মারা গেছেন ২০১৪ সালে। গত ৭বছরে আমার স্বামীর কবরে পানি জমলোনা, এখন পানি জমলো কি করে? মনে করলাম জমেছে, কিন্তু আমার শ্বশুর মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য একেএম সামশুজ্জোহার কবর তো সেখানে ৩৩বছর ধরে আছে, তারও আগে দাদা শ্বশুরের কবর আছে। কখনও শুনিনি সেখানে পানি জমেছে। সেখানে মাটি ফেললো কে? আর নাছির নামে আমার কোন আত্মীয় আছে কিনা আমার জানা নেই কিন্তু মেয়র আইভী জানলেন কি করে? কবরে শ্মশানের মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে বলবো কেন? এটা কোন বিবেকে বলবো? এটা সম্পূর্ণ মিথ্যাচার। বিবৃতিতে এমন বলা হয়েছে। কিন্তু কোন বিবেকবান মানুষ কি পারবে তার বাবা মায়ের কবরে শ্মশানের মাটি ঢেলে দিতে। এই মিথ্যাচারের তীব্র নিন্দা জানাই। তার এমন কাজের জন্য ক্ষমা চাওয়া উচিত।
আওয়ামীলীগের নেতৃবৃন্দ ও সচেতন মহলের সাথে কথা বলে জানা যায়, মাসদাইর কবরস্থানে শ্বশানের পোরা মাটি কবরে ফেলা হয়েছে ক্ষোদ শিকার করেছে সিটি করপোরেশনের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদার, ইমাম ও মোয়াজ্জিন। তাদের স্বীকার করা ভিডিও ইতিমধ্যে ভারাইল হয়েছে। মেয়র আইভী এই প্রকৃত সত্যকে কিভাবে মিথ্যায় পরিনত করছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বন্ধনের আরেক নাম শামীম ওসমান আর তাকেই জড়িয়ে এমন মিথ্যাচার। মেয়র আইভী নিজের দোষ অন্যের উপর চাপানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। ভবিষ্যৎ যাতে এমন কর্মকান্ড আর কেউ করার সাহস না পায় তাই তদন্তপূর্বক দোষীদের আইনের আওতায় এনে বিচার দাবি করেছেন তারা।

