বিজয় বার্তা ২৪ ডট কম
জেলা কারাগার ঘুরে বিশ্বজিত দাস: নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগার এখন আর শুধু অপরাধীদের বন্দীশালা নয়। জেলা কারাগারে প্রবেশের প্রধান ফটাকে বড় বড় অক্ষরে লেখা রয়েছে ‘রাখিব নিরাপদ দেখাবো আলোর পথ’। বিগত সময় গুলোতে জেলা কারাগারের ভেতরে বিভিন্ন অনিয়মের কথা শোনা গেলেও বর্তমান সময়ে প্রধান ফটকে লেখা ওই স্লোগান বাস্তবায়নে নিরলস ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন বর্তমান কারা কর্তৃপক্ষ। এখানে বিভিন্ন অপরাধে আটক থাকা বন্দীদের সাজা ভোগের পাশাপাশি দেখানো হচ্ছে আলোর পথ।
সাজাপ্রাপ্তরা দীর্ঘ সময় নারায়ণগঞ্জ কারাগারে সাজা ভোগের পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে তারা যেন হতাশা গ্রস্থ না হয়ে তাই তাদেরকে আর্তনির্ভরশীল করে তোলা হচ্ছে। কারা কর্তৃপক্ষের নিজস্ব উদ্যোগে তাদেরকে দেওয়া হচ্ছে হস্ত ও কুটির শিল্পের প্রশিক্ষন। শেখানো হচ্ছে বাংলার ঐতিহ্য জামদানী তৈরি কাজ।
তৈরি করা হচ্ছে পুথি দিয়ে তৈরি বিভিন্ন শো’পিস, টিসু বক্স, কাপড়ের ব্যাগ, জামদানি শাড়ি, নকশি কাথা সহ নানা দেশীয় পন্য। আর বন্দীদের তৈরি এসব পন্য বিদেশী রপ্তানির উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।
ইতোমধ্যে আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় জেলা কারাগারের জেল সুপার হালিমা খাতুনের কাছে বন্দীদের তৈরি পন্য বিদেশে রপ্তানি করার লক্ষ্যে ৫ হাজার পিস পুথির তৈরি টিসু বক্স এবং ৫ হাজার পিস কাপড়ের তৈরি ব্যাগের অর্ডার দিয়েছেন বিকেএমইএ সভাপতি ও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান।
সেই লক্ষ্যে বৃহস্পতিবার ১৭ নভেম্বর বন্দীদের তৈরি সে সকল হস্তশিল্পের কাজ সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান। এ সময় তার সাথে ছিলেন নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক রাব্বি মিয়া, জেলা কারাগারের জেল সুপার হালিমা খাতুন, নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কর্মাস এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি খালেদ হায়দার খান কাজল, জেলা সিভিল সার্জন ডাক্তার আশিতোষ দাস, বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন নারায়ণগঞ্জ জেলা সভাপতি ডাক্তার শাহনেওয়াজ চৌধুরী, সদর উপজেলার নারী ভাইস চেয়ারম্যান ফাতেমা মনির সহ জেল পরিদর্শন টিমের সদস্যরা।
সবাইকে সাথে নিয়ে সেলিম ওসমান জেলা কারাগারের ভেতরের বন্দীদের মহিলা ওয়ার্ড, ডিভিশন ওয়ার্ড, কারা জামদানী পল্লী, ঘুরে দেখেন। এ সময় কয়েক’শ বন্দীদের দুই সারিতে বসে হস্তশিল্পের কাজ করতে দেখা গেছে। এছাড়াও নকশি কাথা বুনতে ব্যস্ত দেখা গেছে নারী বন্দীদের। এছাড়াও জামদানী শাড়ি তৈরি কাজে ব্যস্ত দেখা গেছে অনেককে। দীর্ঘ মেয়াদী কারাদন্ড প্রাপ্ত আসামী থেকে শুরু করে স্বল্প মেয়াদে সাজা প্রাপ্তরাও রয়েছেন সেই দলে।
পরিদর্শন কালে সেলিম ওসমান বন্দীদের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করেন। তারা কে কি অপরাধে কারাগারে এসেছে। কে কতটা সময় পার করেছে। ফিরে গিয়ে তারা কি করবে? বন্দীরাও অকপটে তার সাথে খোলামেলা কথা বলেন। এ সময় বেশ কয়েকজন বন্দী তাদের মাদকে আসক্তির কথা তুলে ধরে ফিরে গিয়ে সুস্থ্য জীবন যাপন করার প্রতিশ্রুতি দেন এবং তারা কারাগারে থেকে যে হস্তশিল্পের কাজ করছে ফিরে গিয়ে সেটাই বড় পরিসরে নিজেদের জীবিকা হিসেবে গ্রহণ করবেন বলে সেলিম ওসমানকে জানান।
বন্দীদের এসব কাজের কোন প্রকার পারিশ্রমিক দেওয়া হয় কিনা এ বিষয়ে সংসদ সদস্য জেল সুপারের হালিমা খাতুনের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, যারা কাজ করছে তাদের প্রত্যেককে তাদের পারিশ্রমিক প্রদান করা হয় এমনকি কখনও কখনও তাদের তৈরি পন্য বিক্রি হয়ে যাওয়ার আগেও তাদের পারিশ্রমিক প্রদান করা হয়। সকলের উপস্থিতি বিষয়টি বন্দীরা স্বীকার করেন।
জামদানি শাড়ি তৈরি করা বন্দীরা জানান, তারা সকাল ৭টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত কাজ করে। একটি জামদানী শাড়ি তৈরি করতে তাদের ২০ থেকে ২৫ দিন সময় লাগে। প্রতি শাড়িতে তাদেরকে ১ হাজার টাকা করে পারিশ্রমিক প্রদান করা হয়। তবে তারা যদি দিনে ৮ ঘন্টা করে কাজ করে তাহলে একটি শাড়ি তৈরিতে আরো অনেক সময় লাগবে বলে তারা জানান।
এ সময় জেল সুপার হালিমা খাতুন সংসদ সদস্যকে অবহিত করে বলেন, একটি জামদানী শাড়ি তারা সাড়ে ৩ হাজার টাকা বিক্রি করতে পারে। যার মধ্যে ১ হাজার টাকা পারিশ্রমিক হিসেবে প্রদান করা হয়। সেই সাথে সূতার খরচ রয়েছে। সে সকল বন্দীরা হস্তশিল্পের কাজ করছে বিশেষ করে জামদানী শাড়ি তৈরি শিল্পীদের কাজে আসলে একটু আলাদা খাবার দাবারের ব্যবস্থা করা হয়।
জেলে বসে এসব কাজ করতে কেমন লাগে বন্দীদের উদ্দেশ্যে সেলিম ওসমানের এমন প্রশ্নে বন্দীরা জানান, কাজ করতে তাদের খুবই ভাল লাগে। একদিনে যেমন তারা হস্তশিল্পের কাজ শিখতে পারছে অন্য দিকে তাদের বন্দী সময়ের দিন গুলো ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে কেটে যাচ্ছে। এতে করে তাদের মাঝে মানসিকতার পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে।
পরিদর্শন শেষে জেল সুপার হালিমা খাতুন সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানকে জানান, তাদেরকে যদি দক্ষ প্রশিক্ষক দিয়ে প্রশিক্ষন দেওয়া যায় তাহলে তারা আরো নিখুঁদ ভাবে কাজ গুলো করতে পারতো। এ সময় সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান বন্দীদের তৈরি পন্য বিদেশে রপ্তানী করার ব্যাপারে জেলা কারা কর্তৃপক্ষকে সার্বিক সহযোগীতার আশ্বাস দেন এবং আইনগতভাবে যদি বন্দীদের প্রশিক্ষন দেওয়ার ব্যাপারে তার সহযোগীতার গ্রহনে যদি কোন বাধা না থাকে তাহলে তিনি সার্বিক সহযোগীতা করবেন।
