বিজয় বার্তা ২৪ ডট কম
নাম অন্তর সরকার দীপ্ত। একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। জন্ম ২০০১ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি। গ্রামের বাড়ি ঢাকা জেলার ডেমরা থানাধীন দূর্গাপুর গ্রামে। বাবা পেশায় সাংবাদিক এবং মা একজন সংগীত শিক্ষিকা। অন্তর সরকার দীপ্ত এ দম্পতির একমাত্র সন্তান। জন্মের পর থেকেই ১১ দিন হাসপাতালে থেকে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করতে হয় অন্তর সরকার দীপ্তকে। সৃষ্টিকর্তার কৃপায় ও ডাক্তারদের নিরলস প্রচেষ্টায় অন্তর সাময়িক সুস্থ হলেও পরবর্তীতে তার দুচোখে দেখা দেয় কঠিন সমস্যা। উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন এন্টিবায়োটিক ঔষধ প্রয়োগ করেও এ সমস্যা থেকে পরিত্রান পায়নি অন্তর। চিকিৎসা চলাকালীন সময়ে ডাক্তারগন জানিয়েছেন তার দুটি চোখের দৃষ্টি শক্তি কমে যাওয়ার শতভাগ সম্ভাবনা রয়েছে। অবশেষে ডাক্তারদের কথাই সত্যি হয়। ভারাক্রান্ত মনে হাসপাতাল থেকে অন্তর সরকার দীপ্তকে বাসায় নিয়ে আসেন তার বাবা-মা। এরপর দিন দিন বড় হতে থাকে অন্তর। ২০০১ সালের শেষের দিকে দুই চোখেই অবরন দেখা গেলে ঢাকার কয়েকজন ক্ষ্যাতনামা চক্ষু বিশেষজ্ঞদের কাছে নেয়া হয়। চিকিৎসায় কোন সুফল না পেয়ে ২০১২ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে তাকে কলকাতা নেয়া হয়। কলকাতার স্বনামধন্য চক্ষু হাসপাতাল বেরাকপুর দিশা আই হসপিটালে তার দুচোখের চিকিৎসা করা হয়। এ সময়ে তার দুচোখেই লেন্স বসানো হয় এবং চলাফেরার জন্য চশমা ব্যবহারের পরামর্শ দেয় ডাক্তারগন। বর্তমানে সে চশমা ব্যবহার করে চলাফেরা করতে পারলেও বইপত্রের ছোট ছোট অক্ষরগুলো পড়তে পারে না। তবে বড় বড় অক্ষরগুলো সে পড়তে ও লিখতে পারে। এদিকে মায়ের বই পড়া শুনে শুনে মুখস্থ করে ছোট বেলা থেকেই লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছে অন্তর সরকার দীপ্ত। বর্তমানে সে সিদ্ধিরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড হাই স্কুলের অষ্টম শ্রেনীর ছাত্র এবং এবারের জে.এস.সি পরীক্ষার্থী। সিদ্ধিরগঞ্জ রেবতি মোহন পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের ১১০নং হলরুমে অন্তর জে.এস.সি পরীক্ষা দিচ্ছে। অন্তর সরকার দীপ্ত প্রশ্নপত্র পাঠ করতে পারে না বিধায় পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র পাঠে সহায়তা প্রদানের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক তপন কুমার সরকারের বরাবরে শিক্ষক নিয়োগের আবেদন করলে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কেন্দ্র সচিবকে এ ব্যাপারে অনুমতি প্রদান করেছেন। কেন্দ্র সচিবের নির্দেশনা পেয়ে হল সুপারগন অন্তর সরকার দীপ্তকে প্রশ্নপত্র পাঠে সহায়তা প্রদান করে যাচ্ছেন। আর অন্তর সরকার দীপ্ত প্রশ্নপত্র পাঠ শুনে নিজে উত্তর লিখে জে.এস.সি পরীক্ষা দিচ্ছে।
অন্তর সরকার দীপ্তর মা শিল্পী রানী সরকার জানায়, এটা তার জন্মগত সমস্যা নয়। জন্মের পর তার দুচোখের সমস্যা দেখা দেয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় ডাক্তারগন আমাদের জানিয়েছেন তার দুটি চোখে দৃষ্টিক্ষমতা কমে যাওয়ার শতভাগ সম্ভাবনা রয়েছে। ২০১১ সালের শেষের দিকে তার দুটি চোখে আবরণ দেখা দেয়, তখন সে সুস্থ শিশুর মত চলাফেরা করতে পারছিলনা। পরে তাকে চক্ষু বিশেষজ্ঞদের কাছে নেয়া হয় এবং পরবর্তীতে কলকাতার বেরাকপুর দিশা আই হসপিটালে তার দুচোখের চিকিৎসা করা হয়। এযাবত পরপর তিনবার একই হসপিটালে তার চোখের চিকিৎসা করা হয়েছে। তার দুটি চোখেই ল্যান্স বসানো হয়েছে এবং চশমা দ্বারা সে চলাফেরা করতে পারে। তবে বইয়ের ছোট ছোট অক্ষরগুলো সে দেখতে পারে না। চশমা দ্বারা বড় বড় অক্ষরগুলো সে পড়তে ও লিখতে পারে। তিনি আরও বলেন এই অবস্থার মধ্য দিয়ে আমি তাকে ছোটবেলা থেকেই লেখা-পড়ার জন্য সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছি। আমি বই পড়ে পড়ে তাকে শুনাই, আর সে শোনে শোনে পড়া মুখস্থ করে। তবে তার স্মরণশক্তি অত্যন্ত ভাল এবং পড়া শুনার প্রতি অতি মনোযোগী। এ বছর সে জেএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। আমার ছেলে প্রশ্নপত্র পাঠ করতে পারে না বিধায় মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বরাবর শিক্ষক নিয়োগের আবেদন করলে তিনি কেন্দ্রসচিব কে শিক্ষক নিয়োগের অনুমতি দিয়েছেন আর কেন্দ্রসচিব প্রশ্নপত্র পাঠে হল সুপারগনকে নির্দেশনা দিয়েছেন। সে মোতাবেক হল সুপারগন প্রশ্নপত্র পাঠে আমার ছেলেকে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। আমি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মহোদয়, কেন্দ্রসচিব, হল সুপারগন সহ সকল শিক্ষকদের নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। তিনি আরও বলেন আমার সন্তানের মত যেসব মায়েদের সন্তান রয়েছে তাদের প্রতি আমি অনুরোধ করে বলছি আপনারা তাদের ঘৃণার চোখে দেখবেন না। ওরা আমাদের সন্তান, আমাদের দেশের সন্তান। ওদের প্রতিভাকে বিকশিত করার সুযোগ দিন ওরা সু-শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে আগামী দিনের সুন্দর বাংলাদেশ গড়ায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে। আমি আমার ছেলেকে সু-শিক্ষায় শিক্ষিত করতে একজন মা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি। আপনারাও সঠিকভাবে সন্তানকে সু-শিক্ষায় শিক্ষিত করতে দায়িত্ব পালন করবেন। কারন লেখা পড়া ছাড়া কোন ক্ষেত্রেই উন্নতি করা সম্ভব নয়। পরিশেষে পৃথিবীর সকল শ্রেণী পেশার মানুষের কাছে আমার সন্তানের জন্য আর্শিবাদ কমনা করছি। আপনারা আমার একমাত্র সন্তানের জন্য আর্শিবাদ করবেন। সৃষ্টিকর্তা যেন তার মঙ্গল করেন।
