রণজিৎ মোদক,বিজয় বার্তা ২৪ ডট কম
অমাবস্যার অন্ধকার ভেদ করে আলোর বন্যায় জগত আলোকিত করেন মহামায়া দেবী চন্ডী। এ তিথিতে পূর্ব পুরুষরা বিশেষ করে পিতৃমাতৃর আত্মা মর্তধামে নেমে আসেন। তাদের উদ্দেশ্যে তর্পন শ্রদ্ধাদি দান ধ্যান করলে তারা উদ্ধার হয়ে স্বর্গবাসী হন। এ তিথি গুলোতে শ্রদ্ধাদি করলে একশত গয়া শ্রাদ্ধের ফল হয়। শ্রাদ্ধ বাসরে তুলসি বৃক্ষ থাকলে পিতৃ পুরুষ বিষ্ণু কৃপা লাভ করেন। মহালয়া তিথিতে তর্পন কেন করতে হয়? পিতৃ তর্পন শ্রদ্ধা না করলে কী হয়! মহালয়ার মহাক্ষণে মর্তধামে নেমে আসেন পিতৃ পুরুষ। শুরু হয় দেবী পক্ষ।
পিতা-মাতা হলেন, স্থুলের দেবতা।
তেত্রিশ কোটি দেবতার চেয়েও বড় দেবতা পিতা-মাতা। পিতা-মাতার মনে কষ্ট পেয়ে কোন সন্তানকে অভিশাপ দিলে তেত্রিশ কোটি দেবতার সাধ্য নেই, তা খন্ডন করতে পারে। পিতা-মাতা কোন সন্তানকে অভিশাপ দেন না। তারপরও যদি সন্তানের আচরণে পিতা-মাতার চোখে অশ্রæ ঝরে তবে তা ঈশ্বর সহ্য করতে পারেন না। শাস্ত্রে বলা হয়েছে ‘পিতৃদেব ভব, মাতৃদেব ভব’ পিতা-মাতাকে দেবতা জ্ঞানে পূজা দিলে, সেবা ও শুশ্রæষা করলে দেবতা-ঈশ্বর সবাই সন্তুষ্ট হন। আমাদের প্রথম পরিচয় পিতা-মাতা। পিতা-মাতাকে ভক্তি, শ্রদ্ধা, সেবার মাধ্যমে তাঁদের আর্শিবাদে পৃথিবীতে অমর হয়ে
আছেন এমন অনেক সন্তান রয়েছেন।
যে সন্তান তার পিতাকে অধিক শ্রদ্ধা ভক্তি করেন সেই সন্তান পিতার আর্শিবাদে স্বর্গ সুখে সুখি হন। আর যে সন্তান তার মাতাকে অধিক যতœ করেন, শ্রদ্ধা ভক্তি করেন, সেই সন্তান ইহ জনমে সম্পদশালী, যশখ্যাতি, দানশীল হন। বাংলা ভাষাসাহিত্যের জনক ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যা সাগর মাতৃ ভক্ত ছিলেন। মায়ের ডাকে খরস্রোতা নদী সাঁতরিয়ে রাতের অন্ধকারে মায়ের চরণে প্রণাম জানান। দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা বিমাতা কৌমদিনীর কথায় অভিমান করে বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। পরিশেষে সেই মায়ের নামে মির্জাপুরে বিরাট হাসপাতাল স্থাপন করেন। শুধু তাই কেন ধ্রæব সৎ মায়ের উপর অভিমান করে বনে গিয়ে হরি দর্শন লাভ করেন। এতো শাস্ত্রেরই কথা।
সত্য যুগে প্রহøাদ তার পিতার মুক্তির জন্য নিঃসিংহ রূপী বিষ্ণু পদে মুক্তি কামনা করেন। ক্রেতাযুগে শ্রী রাম পিতা দশরথের প্রতিজ্ঞা রক্ষায় স্বেচ্ছায় চৌদ্দ বছরের জন্য বনে চলে যান। দ্বাপর যুগে ভীষ্ম দেব পিতার মনোরঞ্জনের জন্য কত বড় ত্যাগ স্বীকার করেন। কলির অবতার পুরুষ গৌর সুন্দর জগতের মানুষের মুক্তির জন্য সংসার, স্ত্রী পরিত্যাগ করে মহামন্ত্র বিতরণ করেন। সন্ন্যাস জীবন ধারণ করে কলি যুগে পিতার ইচ্ছা পুরণে লোকনাথ সন্ন্যাস জীবন ধারণ
করেন। একশত রাজসূয় যজ্ঞ করলে যে পূণ্য হয়, পিতার জন্য উপবাস করলে সেই পূণ্য প্রাপ্তি হয়। এই উপবাস যদি তীর্থে করা হয়, তাহলে ওই যজ্ঞে কোটি গুণ বেশি ফল লাভ হয়। পিতার মৃত্যুর পর পূত্র পিতার লাশ কাঁধে তুলে নেন, তিনি প্রতি পদে পদে অশ্বমেধ যজ্ঞের ফল প্রাপ্ত হন।
পিতার মৃত্যু তিথিতে গরুকে শুধু ঘাস খাওয়ানো হয়, তাতে পিÐ দানের চেয়ে বেশি ফল হয়। চন্দ্রগ্রহণের সময় দান ভ‚মিদানের সমান হয়। কথায় আছে গঙ্গার সমান তীর্থ নাই, মাতৃসম গুরু নাই। নারদীয় পুরান : ১৫৬
চন্ডীতত্বে বলা হয়েছে দেবীদুর্গা জগৎ জননী। তিনি অমানিসার অন্ধকার ভেদ করে মহালয়ার মহাক্ষণে পৃথিবীতে পদার্পণ করেন। মঙ্গলময়ীর চরণ স্পর্শে মঙ্গলসূচিত হয়। দেবীকে কেউ বলেন মহামায়া। কেষ্ট বলেন যোগমায়া। মহামায়া রূপে তিনি জগতে সর্বত্র স্নেহ মায়া বিস্তার করেন। মায়া মোহে মানুষ ভালোবাসায় আবদ্ধ হন। আবার মায়ামোহে মানুষ ধৃত রাষ্ট্রের ন্যায় স্বার্থান্ধ হয়ে পড়েন। আবার- দেবীদুর্গা যোগমায়া যোগেশ্বরী তিনি এ জগতের মানুষকে পরম স্রষ্টার পথে যুক্ত করতে সহযোগিতা করেন। বৃন্দাবনে যোগমায়া যোগেশ্বরী বৃন্দাদেবী গোপ-গোপীদেরকে শুদ্ধ ভক্তি প্রদান করে গোবিন্দ সাধনার
সহায়িকা ছিলেন। ‘নম নমো ভুলসী, শ্রী কৃষ্ণ প্রেয়সী ঈশ্বরে সম্পূর্ণ রূপে আত্মসম্পর্ণ না করলে তাঁর কৃপা লাভ করা যায় না। যার যতটুকু ভাব, সে ততটুকুই লাভ করবেন। গীতায় ভগবান শ্রী কৃষ্ণ সে কথাই বলেছেন। মূলত : আমরা কোন কিছু থেকেই মূল শিক্ষা গ্রহণ করি না।
চন্ডীতত্বে মেধামণির আশ্রমে সুরথ ও বৈশ্য মা চন্ডীর সাধনা করেন। সুরথ তার হারানো রাজ্য ফিরে পান, আর বৈশ্য মোক্ষ লাভ করেন।
সৃষ্টিতত্তে¡ মধু কৈটভকে বিষ্ণু তাঁর চক্র দিয়ে ছেদন করেন, তা সেই শক্তি রূপা যোগমায়ার শক্তিবলে। মামা শকুনীর কুমন্ত্রনায় মহাভারতে ভ্রাতৃ বিরোধ। রামায়ণে ভ্রাতৃপ্রেম। এক মন্থরার কু-মন্ত্রনায় অমৃতময় সংসার গরলে পরিণত হলো। গর্ভধারণের পর পিতা-মাতা যে কষ্ট সহ্য করেন, শতবর্ষে শত জন্মে তা শোধ করা যায় না।
(মুন-২-২২৭) পুৎ নামক নরক হতে পিতার আত্মাকে উদ্ধার করে বলে পুত্র। ঠাকুর অনুক‚ল চন্দ্র বলেছেন- ‘পিতার শ্রদ্ধা মায়ের প্রতি টান সে পেলে হয় সাম্য প্রাণ। ’
পিতা-মাতার আত্মার মুক্তি কামনার বার্ষিক তর্পন শ্রদ্ধাদি বা দান ধ্যান না
করলে কী হয়। শাস্ত্র বলছে- সেই সন্তানদের পরিবারে বা সংসারে আয় উন্নতি দুরিভূত হয়। বিভিন্ন রকম অসুখ বিসুখ- রোগব্যাধী এমন কী অমঙ্গল জনক ঘটনা ঘটতে থাকে। স্বজন বিয়োগ ঘটে। কর্মবাদ ও জন্মান্তর বাদ গ্রন্থের একটি গল্প দিয়ে শেষ করবো- কোন এক গ্রামে পুষ্করা লেগে বহু লোক মারা যায়। একটি মাত্র ছোট্ট মেয়ে ভাগ্যক্রমে বেঁচে ছিল। পিতৃ মাতৃ স্বজনহীনা সেই কন্যাসন্তান কালে ভদ্রে ভাগ্যক্রমে বানবনিতার আশ্রয়ে লালিত-পালিত হয়। যৌবনে সে বেশ্যাবৃত্তি গ্রহণ করে। একদিন নারদ মুনি নরক দর্শন করে বিষ্ণুকে বলেন- প্রভু এক এক করে নরকে মানুষ মুক্তি পাচ্ছে। কিন্তু দুইজন ব্যাক্তি বহুদিন ধরে নরকে যন্ত্রণা ভোগ করছে। এদের মুক্তির উপায় কি? বিষ্ণু বললেন- এদের উদ্দেশ্যে কেউ যদি কিছু দান করে তবে এরা মুক্তি পাবে। মর্তধামে এদের এক মেয়ে রয়েছে তাকে কিছু দান করতে বলো। নারদ সাধুর বেশে সেই মেয়ের কাছে গিয়ে তার মা-বাবার উদ্দেশ্যে কিছু দান চাইলেন। এ কথা শুনে সেই মেয়ে তার মা বাবার উদ্দেশ্যে কটু কথা বলে সাধুকে শুন্য হাতে বিদায় করলেন। বেশ কয়েকদিন পর নদীর তীরে সেই মেয়েকে স্নান করতে দেখে, সেইখানেই গিয়ে তার পিতা মাতার উদ্দেশ্যে দান চাইলেন। আর কিছু না দাও তিন আঞ্জলি জল দাও মা। সেই
মেয়ে সাধুকে তিন আঞ্জুলি নদীর জল ছিটিয়ে দিলেন। নারদ মুনি নরকে এসে দেখে, সেই দুই ব্যাক্তি নরক থেকে মুক্তি লাভ করে স্বর্গধামে স্থান পেয়েছেন। নারদ বিষ্ণুকে জিজ্ঞাসা করায় বিষ্ণু বললেন- দেখ যে স্থানে জল ছিটিয়ে দিয়েছে সেখানে নিশ্চয়ই কোন প্রাণী তা গ্রহণ করেছে। নারদ দেখলেন হ্যাঁ নদীর তীরে দলবাদা পিপিলিকা জলের জন্য অবস্থান করে ছিলেন, তারাই সেই জল গ্রহণ করেছে। মহালয়ার মহাক্ষণ থেকে দ্বিপানিতা দ্বিপাবলী পর্যন্ত পিতৃ পুরুষের আত্মা মর্ত্যধামে অবস্থান করেন। এ সময় তাদের আত্মার শান্তি ও নিজেদের মঙ্গলের জন্য দান ধ্যান বৈষ্ণব সেবা এবং পিতৃ দর্পন উচিৎ। পিতা-মাতা আমাদের জীবন দান করেন। তাই পিতা মাতা দেবতুল্য ও আরাধনা যোগ্য। তাদের বাণী অনুস্মরণ করে নিজেদের জীবন গড়তে হবে। দেশ জাতি তথা সমগ্র বিশ্বকে শ্বাশত কল্যাণের দিকে এগিয়ে নিতে হবে। এই হোক মহালয়ার মহাক্ষণের মঙ্গল প্রার্থনা।

