বিজয় বার্তা ২৪ ডট কম
নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জে বিস্ফোরণের কারনে ঝুঁকিপূর্ন ভবনটি ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দিয়েছে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশেন। বুধবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ভেকু দিয়ে অপসারন করেছে তারা।
এদিকে শাহজাহান নামে আহত আরো এক শ্রমিক শেখ হাসিনা হাসপাতালে বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীণ অবস্থায় মৃত্যু বরণ করেছেন। এ নিয়ে ডালপট্টিতে বিস্ফোরণে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ালো ৩ জনে। বাকি ৬ জন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। ঘটনার পাঁচ দিন পেরিয়ে গেলেও ক্ষতিগ্রস্থদের পাশে দাঁড়ায়নি জেলা প্রশাসন ও ভবন মালিক। গতকাল মঙ্গলবার (২১ মার্চ) জেলা প্রশাসন, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন, গনপুর্ত বিভাগ, ডিপিডিসি, তিতাসসহ মোট ৯টি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও বৈঠক করে সমন্বয় কমিটি গঠন করেন। পরে ঝুকিপুর্ণ ভবনটি ভেঙ্গে ফেলার জন্য মালিককে নোটিশ টানিয়ে দেয়। ঘটনার ৫ দিন পেরিয়ে গেলেও ভবন মালিক এখন পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্তদের বিষয়ে কোন খোজ খবর নেয়নি। এদিকে এখন পর্যন্ত জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে কোন তদন্ত কমিটি এবং কোন দপ্তর থেকে কোন মামলা দায়ের করা হয়নি।
নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের নগর পরিকল্পনাবিদ মঈনুল হোসেন জানান, গত ১৮ মার্চ একটি পরিত্যাক্ত ভবন বিস্ফোরণে ধসে পড়ে। এই ঝুঁকিপূর্ন ভবন নিয়ে ঘটনাস্থলে সরকারী বেসরকারী ৯টি প্রতিষ্ঠান মিলে পরিদর্শন ও বৈঠক করেছিলাম। তার আলোকে এই ভবনটি অপসারনের ব্যবস্থা গ্রহন করি যাতে মানুষের জানমালের ক্ষয়ক্ষতি না হয়। নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আমরা এই কার্যক্রম পরিচালনা করেছি। এপাশের কম ঝুঁকিপূর্ন ছিল সেখানে অপসারন করে মালমালগুলো আমরা তাদের বুঝিযে দিয়েছি। অপর পাশে যে মালমাল আছে সেগুলোও আমরা পর্ায়ক্রমে বুঝিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করবো।এটি আমরা সব প্রতিষ্ঠান মিলে সমন্বয় করে কাজ করছি। বৈঠক করে সবাই মিলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যত দ্রুত যাতে এই ভবনটি অপসারন করা যায়। সেখানে সব প্রশাসনই ছিল।আমার কিন্তু সেই কাজটিই করেছি। এখানে পুলিশ প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ছিল কিন্তু জেলা প্রশাসকের কাউকে দেখা যায়নি। ভবন মালিকের সাথে বিভিন্ন যোগাযোগ চেষ্টা করা হয়েছে কিন্তু তাকে পাওয়া যায়নি।
এই বিস্ফোরণে আমাদের তিনজন শ্রমিক মারা গেছেন এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। এখন পর্যন্ত জেলা প্রশাসক, ভবন মালিক ও জনপ্রতিনিধি কারো কাছ থেকেই আমাদের শ্রমিকদের জন্য সহযোগীতা পাইনাই। তারা নিহত ও আহতদের কোন খোঁজ খবরও নেয়নি। আমরা শ্রমিক বলে কি আমাদের দাম নাই। আমাদের শ্রমিক মারা গেল ও আহত হলো কিন্তু এই ভবন মালিক আজ অবধি কোন খোঁজ নেয়নি। এখন পর্যন্ত সরকারীভাবে কোন সহযোগীতা পাই নাই। আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষন করে বলছি। আমাদের ক্ষতিগ্রস্থ শ্রমিকদের জন্য সহযোগীতা করা হোক। যাদের গাফলতির কারনে এই বিস্ফোরণে মত এত বড় দূর্ঘটনা ঘটেছে তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে বিচার দাবি করছি।
ভবনে ক্ষতিগ্রস্থ রাজলক্ষী ভান্ডারের মালিক দগ্ধ রাজনের ভাই জানান, এই দূর্ঘটনায় আমার ভাই সহ দুইটা লোক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছটফট করছে। এখন পর্যন্ত একটা প্রশাসনের লোক বা ভবন মালিক কোন খোঁজ খবর নিলনা। আমরা ভাই ও ম্যানেজারকে নিয়ে হাসপাতালে দৌড়াচ্ছি। এদিকে আমাদের প্রশাসন আশ্বাস করলো ভিতরে আটকে থাকা মালের কোন ক্ষতি হবেনা। কিন্তু তারা আজকে আমাদের মাল সহ বিল্ডিং এর ভেঙ্গে ফেলছেন। আমাদের মালগুলো তো বের করে দিবেন। আমরা নিঃস্ব হয়ে গেলাম। আমাদের ক্ষতিপূরনগুলো কে দিবে। আমরা অবশ্যই এ ব্যাপারে আইনের আশ্রয় নিবো। যাদের গাফলতির জন্য এই দূর্ঘটনা ঘটেছে তাদের আমি বিচার চাই। আমার বিচার যদি নাই পাই আমি নিজে আত্মহত্যা করবো। আমি আত্মহত্যা করে এটা ইতিহাস রেখে যাবে। আমি এর অবশ্যই বিচার চাই।
নারায়ণগঞ্জ পাইকারী-খুচরা ব্যবসায়ি সমিতির সাধারণ সম্পাদক শঙ্কর সাহা বলেন, দূর্ঘটনা ঘটলে নিয়ম তো সরকারের পক্ষ থেকে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা এবং জেলা প্রশাসকের তদন্ত কমিটি গঠন করে। কিন্তু এ ঘটনায় আমি এই রকম কিছু শুনি নাই যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসকের লোক আসে দেখে সিটি করপোরেশনকের দায়িত্ব পালন করার কথা বলে। তাহলে তারা কি করছে। এখন পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্থদের জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে কেউ সহযোগীতা করে নাই। আমি আবেদন করছি ক্ষতিগ্রস্থদের সহযোগীতার আবেদন জানাচ্ছি। আবারও বলছি কেউ করলে আমি নিজেই এ বিষয়ে মামলা দায়ের করবো। যাদের গাফলতির জন্য যাদের জীবন গেছে এবং আহত হয়েছে এবং দোকানদের কোটি কোটি টাকার মালামাল নষ্ট হইছে। তাদের বিরুদ্ধে শতভাগ আমরা ন্যায় বিচার চাই এবং ক্ষতিপূরন চাই। মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা বন্ধ করুক এবং এসমস্ত ঝুঁকিপূর্ন ভবন অপসারন করা হোক।
দূর্ঘটনাস্থলের স্থানীয় জনপ্রতিনিধি নাসিকের ১৫ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর অসিত বরণ বিশ্বাস বলেন, ডালপট্টিতে এখন পর্যন্ত আজকে একজন নিয়ে তিন জন মৃত্যুবরণ করেছে। আরো বেশ কয়েকজন আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এখানে গাফলতির প্রশ্ন বিচারের প্রশ্ন তো আসবেই। আমরা কথা হলো পরিস্কার যেখানে এ ধরনের দূর্ঘটনা ঘটে সেখানে একটা সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া দরকার। সমন্বয়ের অভাবে এই কাজ করা হয়না। আমরা দূর্ঘটনার পরবর্তী যে কাজ সেটা নিয়ে ব্যস্ত আছি।
বিশিষ্ঠ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বী বলেন, যে ঘটনাগুলো ঘটছে বেশীরভাগই গ্যাস লাইনই মূল কারন হিসেবে সামনে আসছে। অপরিকল্পিত গ্যাস লাইন সংযোগ দেওয়া এবং ভবনগুলো নকশা ছাড়া নির্মান করা হচ্ছে। এছাড়া পুরাতন জরাঝীর্ন ভবন এই দূর্ঘটনার কারন। এদের সাথে জড়িত কোন সংস্থাই এই দূর্ঘটনার দায় এড়াতে পারেনা। সেই সাথে ভবন মালিকদের গাফলতি রয়েছে। তাদেরকেও সচেতন হতে হবে। সেই সাথে সবাই সতর্কতার সাথে কাজ করলে দূর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব। যারা নিহত ও আহত হয়েছে তাদের পরিবারের পাশে সরকারের দাঁড়ানো উচিত।
এ ব্যাপারে চাইলাউ মার্মা বলেন, এ ব্যাপারে ক্ষতিগ্রস্থ বা কোন কেউ এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে কোন অভিযোগ দেয়নি। তাই মামলা হয়নি। যদি কেউ অভিযোগ করে তবে অবশ্যই মামলা নেওয়া হবে। ঘটনার কারন সম্পর্কে ওই দিনই ফায়ার সার্ভিস প্রাথমিকভাবে বলেছে গ্যাসের লিকেজ থেকে এই দূর্ঘটনা ঘটছে। মূল কারন টা সূশ্লিষ্ট দপ্তর তদন্ত করে দেখছে। ঝুকিপূর্ন বিল্ডিংগুলো না ব্যবহার করাই ভাল। ভাড়া নেওয়া এবং দেওয়ার আগে দূর্ঘটনার বিষয়টি মাথায় রেখে কাজ করা দরকার।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মৌসুমী বাইন হীরা জানান, আমরা জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে সেদিন ঘটনাস্থলে গিয়েছি। বিষয়গুলো পরিদর্শন করে দেখেছি এবং সার্বিক প্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনকে অবগত করেছি। যেহেতু এটা সিটি করপোরেশেনের এলাকার আওতাধীন। এ ব্যাপারে তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টি আমার জানা নেই। অনাকাংখিত দূর্ঘটনা কারোই কাম্য নয়। ভবিষ্যতের জন্য সবাইকে এ বিষেয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

