বিজয় বার্তা ২৪ ডট কম
আজ বক্তাবলী গনহত্যার ৫১ বছর । দিনটি ছিল ১৯৭১ সালের ২৯ নভেম্বর। সেদিন ভোরে ঘন কোয়াশায় ডাকা ছিল নারায়ণগঞ্জের বক্তাবলীর গ্রাম। নদী বেষ্টিত চরাঞ্চলের মানুষ ছিলেন ঘুমিয়ে। এই দিনে ঘুমন্ত ১৩৯ জন নিরহ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করে পাক হানাদারবাহিনী। এই দিনটি গ্রামবাসীর জন্য শোকের দিন। স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও এখনো রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও মূল্যায়ন পাইনি বলে দাবি শহীদ পরিবারগুলোর। ২৯ নভেম্বর শীতের কাক ডাকা ভোরে গান ভোট দিয়ে বক্তাবলীতে প্রবেশ করেন কয়েকশ পাকবাহিনী। এই গ্রামটি মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপদ ঘাটি হিসেবে পরিচিত ছিল। তাই রাজকারদের সহায়তায় বক্তাবলীতে হানা দেয় পাকসেনারা। মুক্তিবাহিনী সন্দেহে একে একে নিরহ মানুষদের ধরে নিয়ে আসে পাকবাহিনী। সবাইকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করায় ধলেশ্বরী নদীর পাড়ে। পরে সবাইকে ব্রাশ ফায়ার করে একসাথে হত্যাযজ্ঞ চালায় পাক হানাদাররা। হত্যাকান্ডে গ্রামের হলুদ সরিষা ও ধান ক্ষেত সেদিন হয়ে উঠে লাল। এই অঞ্চলের গ্রামগুলোর বাড়িঘর ও ক্ষেত আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে ছাই করে দেওয়া হয়। লক্ষীনগর কবরস্থানের সামনে আশ্রয় নেওয়া গ্রামবাসীকে একসাথে মারা হয় আগুনে পুড়িয়ে। যুবক থেকে বৃদ্ধ কাউকেই ছাড় দেয়নি পাক হানাদারবাহিনী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মনিরুজ্জামান ও তার ভাই শাহ আলমকে ঘর থেকে টেনে বের করে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করেন। সেদিন শিক্ষক, ছাত্র সহ খেটে খাওয়া সাধারণ কৃষকদেরও হত্যা করেন পাকবাহিনী। ব্রাশফায়ার করে হত্যার পর পাকবাহিনী রাইফেলের নল দিয়ে খুচিয়ে খুচিয়ে নিরহ মানুষগুলোর মৃত্যু নিশ্চিত করেন। মরদেহগুলো লক্ষীনগর কবরস্থানে একটি বড় গর্ত করে এক সাথে গনকবর দেওয়া হয়। ২৯ নভেম্বর দিবসটি শোক দিবস পালন করেন বক্তাবলী বাসী। স্মতিচারণ হিসেবে সেখান একটি বধ্যভূমি নির্মাণ করা হয়েছে। দিনটি এলে এই বধ্যভূমিতে ফুলেল শ্রদ্ধা জানান গ্রামবাসী। মুক্তিযোদ্ধে এতবড় আত্মত্যাগ দিলেও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও মূলায়ন না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্বজন ও স্থানীয় গ্রামবাসী। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান খোঁজ নিয়ে বক্তাবলীর শহীদ পরিবারগুলোকে প্রথম মূল্যায়ন করেছিলেন। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত কোন জনপ্রতিনিধি মূল্যায়নের আশ্বাস দিয়েও তা পূরন করেননি বলে দাবি বক্তাবলীবাসীর।
শহীদ মনিরুজ্বামান ও শাহ আলমের ছোট ভাই শাহীন বলেন, সেদিনের ঘটনা আমাদের জীবনের সবচেয়ে দুঃখের এবং বেদনার। পাকবাহিনী ২৯ নভেম্বর কেউ বুঝে উঠার আগেই আক্রমন করে হত্যাকান্ড চালায়। আমার দুইভাই ও আমার একজন জেঠাতো ভাই সহ তিনজনকে ধরে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। আমি ছোট ছিলাম কিন্তু সব দৃশ্যগুলো এখনো মনে পরলে আমায় কাদায়। পাকবাহিনী ও রাজকাররা এই গ্রামকে ধ্বংসস্তূপে পরিনত করেছে সেদিন। আমরা যারা শহীদ পরিবার আছি এখনো কোন স্বীকৃতিও পাইনাই ও কোন সহযোগীতাও পাইনি। স্বাধীনের পরে দেশ অনেক এগিয়েছে এবং মানুষের অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে সব কিছুর পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু আমাদের ১৩৯ জন শহীদ পরিবারের তাদের কারো কোন অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। দেশ স্বাধীন হয়েছে আমাদের ভাইয়েরা রক্ত দিয়েছে। কিন্তু আমরা কোন সহযোগীতার পাইনি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আমাদের অনুরোধ ১৩৯ শহীদ পরিবারগুলোকে যাতে স্বীকৃতি দেয় এবং সহযোগীতা করে। তাহলে আমরা তার কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকবো।
শহীদ পরিবারের আরেক স্বজনহারা আলী হোসেন বলেন, যাদের রক্তের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন হলো। আজকে সেই ১৩৯ জন শহীদ পরিবার অবহেলিত। ১৯৭১ সালে এদেশ স্বাধীন হয়েছে। ৭২ সালে এ বঙ্গবন্ধু প্রতিটি শহীদ পরিবারকে ২ হাজার টাকা করে অনুদান দিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর অনুদানের পরে আজকে ৫১ বছর পার হয়ে গেল। কিন্তু কোন জনপ্রতিনিধি আজও কোন সহযোগীতা করেননি। এই শহীদ পরিবারের ৯৯ ভাগ লোক গরীব। কোন এমপি মন্ত্রী ও চেয়ারম্যান তাদের ভাল মন্দের কোন খোঁজ খবর নেয় নাই। আমার একটাই দাবি এই ১৩৯ জন শহীদ পরিবার কিভাবে আছে সরকার যাতে তাদের খোঁজ খবর নেয় এবং তাদের সহযোগীতা করেন।
বক্তাবলীর স্থানীয় বাসিন্দা এক যুবক রাসেল বলেন, প্রতি বছর যখন ২৯ নভেম্বর আসে তখন আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। অনেক সময় পেড়িয়ে গেছে অনেক সরকার আসছে গেছে এই বক্তাবলীর ১৩৯ শহীদদের আজও স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। আওয়ামীলীগ সরকার তিনবার টানা ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও এখানকার জনপ্রতিনিধি যারা আছে তাদের কাছে আমরা বক্তাবলীবাসী বারবার অনুরোধ করেছি। তাদের কাছে ইতিহাস তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তারা আমাদের আশ্বাসের পর আশ্বাস দিয়ে গেছেন। দুঃখের বিষয় আজ পর্যন্ত সেই আশ্বাসের কোন বাস্তবায়ন হয়নি এবং শহীদদের সরকারী স্বীকৃতি হয়নি। এটা আমরা অত্যন্ত দুঃখিত ও ব্যথিত। নতুন প্রজম্ম হিসেবে আমরা চাই আমাদের গ্রামের ১৩৯ জন শহীদদের রক্তের বিনিময়ে আমরা যে স্বাধীনতা পেয়েছি। সে কারনে শহীদ পরিবারগুলোকে তাদের প্রাপ্ত মর্যাদাটুকু দেওয়া হোক।
এ বিষয়ে বক্তাবলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শওকত আলী বলেন, বক্তাবলীর ১৩৯ জন যে আত্মত্যাগ দিয়েছে আমাদের মাননীয় এমপির নলেজে আছে। তাদের জন্য তাদের পরিবারের জন্য এমন একটা জিনিষ তিনি করতে চান। তারা যে আত্মহুতি দিছে তারা যেন স্বীকৃতি পায়। তারা যেন মনে করে আমরা রাষ্ট্রকে রক্ত দিয়েছি রাষ্ট্র আমাদের সম্মাণ দিয়েছে। এটা আমরা চেষ্টা করতেছি।
এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি একেএম শামীম ওসমান বলেন, বক্তাবলীতে ১৩৯ জনকে একসাথে হত্যা করা হয়েছে এটা আমাদের জন্য খুবই মর্মাহত বিষয়। ওনারা তো মুক্তিযোদ্ধা না ওনারা শহীদ, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। তাদেরকে তো আর কিছুভাবে সম্মান জানানোর সুযোগ নাই। আমরা অতীতেও এটা নিয়ে কাজ করেছি। আপনারা জানেন ওইখানে স্মৃতিসৌধ হয়েছে নামফলক হয়েছে। প্রতি বছর বছর অনুষ্ঠান হয়। তাদের একটা চাহিদা আছে যে জাতীয় সংসদে এই বিষয়টাকে উৎথাপন করা। তারা যেন শহীদের মর্যাদা পান ইনশাল্লাহ আগামী জাতীয় সংসদে আমি এই বিষয়টাকে উৎথাপিত করবো। যাতে এই শহীদ পরিবারগুলো সরকারী যে সুযোগ সুবিধাগুলো আছে সেগুলো পান। সুযোগ সুবিধার থেকে বড় কথা হচ্ছে সম্মান টা পাওয়া। এটা কার্যকর করার জন্য যা কিছু করনীয় আমরা সেটা করবো।
দেশ স্বাধীনে এই বক্তাবলীবাসীর বিশাল অবদান রয়েছে। তাই শহীদদের একটু মর্যাদা চান ও পরিবারগুলোর যথাযথ মূল্যায়ন চান নারায়ণগঞ্জবাসী।

