বিজয় বার্তা ২৪ ডট কম
নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় মো. বায়োজিদ নামের ৮ বছরের শিশু অপহরণের ঘটনায় সংঘবদ্ধ পাচারকারী চক্রের ৬ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে অপহরণ কাজে ব্যবহৃত পিস্তল, ম্যাগজিন, ৩রাউন্ড গুলি, ২টি চাকু, চাপাতি, ১ হাজার ২০ পিছ ইয়াবা, অপহৃত শিশুদের অজ্ঞান করতে ব্যবহৃত ২৩টি চেতনা নাশক ইনজেকশন, ২টি ব্যবহৃত ইনজেকশন, ১৪টি সিরিঞ্জ এবং ১৭ টি মোবাইল সেট। গত ৭ ফেব্রুয়ারী হতে বৃহস্পতিবার ৯ ফেব্রুয়ারী ভোর পর্যন্ত র্যাব এসব অভিযান চালিয়েছে বিকেলে গণমাধ্যমে পাঠানো প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
র্যাব বিজ্ঞপ্তিতে জানান, বন্দর উপজেলা হতে গত ৯ জানুয়ারী অপহরণ হয় ৮ বছরের শিশু বায়োজিদ। অপহরণের পর দাবী করা হয় মুক্তিপণ। বিষয়টি র্যাব জানার পর গত ১৮ জানুয়ারী নারায়ণগঞ্জের শিমরাইল এলাকা থেকে বায়োজিদকে উদ্ধার করলেও পালিয়ে যায় অপহরণকারী চক্রের সদস্যরা। এর পর থেকেই র্যাব তাদের গোয়েন্দা নজরদারী বাড়িয়ে দেয়। গত ৭ ফেব্রুয়ারি হতে ৯ ফেব্রুয়ারী ভোর পর্যন্ত ঢাকার সায়েদাবাদের জনপদ রোড, নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের বাগমারা এলাকা থেকে ৬জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তারা হলো শিশু অপহরণ ও পাচারকারী চক্রের মূল হোতা মোঃ জাকির হোসেন (৫৫) ও তার সহযোগী স্ত্রী মর্জিনা বেগম ওরফে বানেছা (৪০), মোঃ টিটু (২৯), মোহাম্মদ হোসেন সাগর ওরয়ে দেলু (২২), জেসমিন বেগম (৩৭) ও মোঃ আসলাম ওরফে আলামিন (২৮)।
গ্রেপ্তারকৃতরা শিশু বায়েজিদকে অপহরণের বিষয়ে স্বীকারোক্তি প্রদানসহ অন্যান্য আরও অপরাধের লোমহর্ষক বর্ননা দেয়। অপহরণকারীরা একটি সংঘবদ্ধ শিশু অপহরণ ও পাচারকারী দলের সিন্ডিকেট সদস্য। তারা শিশু অপহরণের উদ্দেশ্যে যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, নারায়ণগঞ্জ, চিটাগাং রোডস্থ বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড, কমলাপুর রেলস্টেশন এবং ঢাকা সদরঘাট এলাকায় ছদ্মবেশে মাইক্রোবাস যোগে ঘুরে বেড়ায়। সুযোগ বুঝে জনসমাগম এলাকায় কোন শিশু পরিবার হতে সামান্য বিচ্ছিন্ন হতে দেখলেই এরা অপহরণ করে শিশুকে চেতনা নাশক ওষুধ প্রয়োগ করে অবচেতন করে ফেলে বা কৌশলের আশ্রয় নিয়েও মাইক্রোবাসে তুলে ফেলে। অপহরণ করার পর তারা জাকিরের বাসায় অপহৃত ভিকটিমদেরকে নিয়ে যায় এবং সেখানে চেতনানাশক ওষুধের মাধ্যমে অবচেতন করে রেখে মুক্তিপণ আদায়ের চেস্টা করে থাকে এবং কিছু কিছু ছেলেদের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করে দেয়।
অপহরণের পর কখনো কখনো মুক্তিপণ দেওয়ার পরও ভিকটিমকে হস্তান্তরের সময় ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে তারা শিশুদেরকে হত্যা করে লাশ গুম করে ফেলত। অন্যদিকে একাধিক শিশুকে আটক ও অতিরিক্ত মাত্রায় চেতনা নাশক প্রয়োগের ফলে মারা গিয়েছে বলে তার স্বীকার করেছে। তারা জানায় যে, পাড়া প্রতিবেশীর দৃষ্টি এড়াতে শিশুদের চেতনানাশক ঔষধ প্রয়োগ করা হত।
এই চক্রটি অপহৃত শিশুদের বিদেশে পাচারের উদ্দেশ্যে মুনির হোসেন এবং ধৃত জেসমিন ও তার স্বামী জহির কর্তৃক ‘ওমানে’ অবস্থানকারী সিন্ডিকেট সদস্য শাহবুদ্দিন এর নিকট হস্তান্তর করে থাকে। আটককৃতরা জানায় তারা শাহবুদ্দিনকে বাচ্চা দিলে শাহবুদ্দিন মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে প্রাচার করে। বিদেশে পাচার করতে পারলে তারা ৩-৫ লক্ষ টাকা পেয়ে থাকে। তারা শিশু-বাচ্চাদের বিভিন্ন প্রলোভন, লোভ বা ব্রেন ওয়াশ করে এয়ারপোর্টে নিজ সন্তান সাজিয়ে বাহকের মাধ্যেম বিদেশে প্রেরণ করে থাকে। তারা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাচ্চাদের পাসপোর্ট করায় বলে জানিয়েছে। এই চক্রটি শিশুদের অরগান বিক্রির ব্যবসার সাথেও জড়িত রয়েছে বলে জানায়। ‘ওমানে’ অবস্থানকারী শাহাবুদ্দিন তার পরিবার নিয়ে প্রায়শ বিদেশে শিশু পাচারের জন্য মধ্যেপ্রাচ্যে গমনাগমন করে থাকে বলে আটককৃতরা তথ্য দিয়েছে।
আটককৃত ব্যক্তিরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এ পর্যন্ত ১৭শিশু অপহরণের কথা স্বীকার করেছে। যার মধ্যে ৮ জনকে মুক্তিপণের বিনিময়ে ছেড়ে দিয়েছে, ০৬ জনকে বিদেশে পাচার করেছে এবং মাত্রাতিরিক্ত ওষুধের ব্যবহারে ০২জন শিশুকে হত্যা করে লাশ নদীতে ফেলে দিয়েছে বলে তারা জানায়। অবশিষ্ট ১ জন শিশু বায়েজিদ, র্যাব কর্তৃক উদ্ধার হয়েছে। অপহরণ সংক্রান্ত ঘটনাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য শিশু ইমন অপহরণ ও বিদেশে পাচার এবং শিশু আকাশ ও শিশু নাজমুল অপহরণ ও হত্যাকান্ড। গত নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে বরিশালের মোঃ ইমন (১৪) নিখোঁজ হয়। ঢাকা সদর ঘাট এলাকায় একাকী দেখে অপহরণ করে; পরবর্তীতে শিশুটির পরিবার মুক্তিপণ না দেওয়ার কারণে তারা শিশুটিকে বিদেশে পাচারের উদ্দেশ্যে শাহাবুদ্দিনের নিকট হস্তান্তর করে। তাদের ধারনা শিশুটিকে শাহাবুদ্দিন মধ্যপ্রাচ্যে পাচার করেছে। এছাড়া তারা জাহিদ এবং জুয়েল ওরফে জাবেদ হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত বলে স্বীকারোক্তি দেয় । তারা জানায় যে, তাদের সিন্ডিকেটের সদস্য জাহিদকে মাদক সংক্রান্ত টাকা পয়সার ভাগাভাগির কোন্দলের কারণে আনুমানিক দেড় মাস পূর্বে জাকির ও দেলু একত্রে জাকিরের বাসায় হত্যা করে। পরে ডেমরা থানাধীন ঢাকা-চিটাগাং মহাসড়কের যাত্রাবাড়ী থেকে সাইন বোর্ড মেইন রাস্তার উত্তর পাশের্¡ রাজধানী ফিলিং স্টেশনের ২০০ গজ পুর্বে একটি পুকুরে লাশ ফেলে দেয়।
