বিজয় বার্তা ২৪ ডট কম
তিনের মধ্যেই আটকে আছে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগ। দীর্ঘ ১৯ বছর পর সভাপতি, সহসভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষিত হয়েছে ৯ মাস আগে। কিন্তু দীর্ঘ এ সময়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি। কমিটি না হওয়ার পেছনে রয়েছে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, ঘোষিত আংশিক কমিটির তিন নেতার মধ্যে অনৈক্য, পছন্দের লোককে অন্তর্ভুক্ত করার মিশনসহ নানা কারণ। ফলে কবে নাগাদ পূর্ণাঙ্গ কমিটি আলোর মুখ দেখবে তাও নির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না আংশিক কমিটির তিন নেতা।
তবে দলীয় একটি সূত্রমতে, পূর্ণাঙ্গ কমিটির খসড়া দলের হাইকমান্ডের টেবিলে জমা দেয়া হয়েছে। যাচাই-বাছাই ও কাটছাঁট হয়ে সেখান থেকেই ঘোষণা আসবে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি। আরেকটি সূত্র জানায়, কমিটিতে স্থান পেতে দলের শীর্ষ নেতাদের দরজায় কড়া নাড়ছেন অনেকেই। চলছে নানা উপায়ে তদবির আর দৌড়ঝাঁপ। নিজের পক্ষে একটু সুপারিশ করাতে কারো কারো চোখে ঘুম নেই। তাছাড়া কমিটি নিয়ে জল্পনা-কল্পনারও শেষ নেই আওয়ামী শিবিরে। এদিকে পূর্ণাঙ্গ কমিটি না হওয়ায় দলের কার্যক্রম স্থবির হয়ে আছে। যার কারণে গত ৯ মাসে জেলা আওয়ামী লীগের ব্যানারে কোনো কর্মসূচি পালন হয়নি। সর্বশেষ ২৩শে জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানও জেলা আওয়ামী লীগের ব্যানারে পালিত হয়নি।
সূত্রমতে, আওয়ামী লীগের ২০তম জাতীয় সম্মেলনের পর নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। বর্তমানে নেতাদের কেউ প্লাস কেউ মাইনাসের মারপ্যাঁচে পড়ে গেছে। বছরের পর বছর ধরে দুই ধারায় বিভক্ত নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি কখনও এক হতে পারেনি। শহরের উত্তর-দক্ষিণে দুটি বলয় ঘিরেই নেতাকর্মীরা বিভক্ত। উত্তরের নেতৃত্ব এককভাবে শামীম ওসমান দিলেও দক্ষিণের নেতৃত্বে নেতার পরিবর্তন ঘটেছে বিভিন্ন সময়ে। তবে শেষ পর্যন্ত জেলা আওয়ামী লীগের আংশিক কমিটি ঘোষনার মধ্য দিয়ে দক্ষিনের নেতৃত্বে এখন সিটি মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভী।
গত বছরের ৯ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে কেন্দ্র থেকে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের তিন সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে সভাপতি হিসেবে সাবেক জেলা পরিষদ প্রশাসক আবদুল হাই ও জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত মো. শহীদ বাদলকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। আর নাসিক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে জেলা কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি পদে রাখা হয়। আংশিক কমিটি ঘোষণার পর নেতাকর্মীরা আশা করেছিলেন নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগ নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। সকল ভেদাভেদ ভুলে শিগগিরই নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগ পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হবে। আংশিক কমিটি ঘোষণার পর ওই তিন নেতা একটি বারের জন্যও এক টেবিলে বসতে পারেননি। ফলে গত ৯ মাসেও তাদের পক্ষে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা সম্ভব হয়নি। জেলা সভাপতি আব্দুল হাই এবং সাধারণ সম্পাদক শামীম ওসমানের ঘরানার লোক। জেলা পরিষদ নির্বাচনে আব্দুল হাই চেয়ারম্যান হতে না পেরে শামীম বলয় থেকে বেরিয়ে মেয়র আইভী বলয়ে চলে যান। স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, আব্দুল হাই মেয়র আইভীর পক্ষে এবং আবু হাসনাত শহীদ মো. বাদল শামীম ওসমানের পক্ষের লোক হওয়ায় তারা নানা অজুহাতে একত্রে বসতে পারেননি বলেই পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নেতা জানান, ঘোষিত আংশিক কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মাঝে সমন্বয় নেই। তারা দু’জনে দু’মেরুর। তারা দু’জনে অনৈক্যের পথে হাঁটছেন। ফলে ২০১৬ সালের ২২ ও ২৩শে অক্টোবর কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের কাউন্সিল হওয়ার আগেই নারায়ণগঞ্জ থেকে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করে জমা দেয়ার কথা থাকলেও অভ্যন্তরীণ কোন্দল আর অনৈক্যের কারণে তা হয়নি।
সূত্রমতে, ২ মাস আগে আংশিক কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মাধ্যমে পৃথক দুটি কমিটির খসড়া কেন্দ্রে জমা পড়েছে। ওই দুটি খসড়া কমিটি দলের হাইকমান্ডের টেবিলে। এরমধ্যে খসড়া কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত অনেকের বায়োডাটা জানতে চাওয়া হয়েছে কেন্দ্র থেকে। এখন চলছে যাচাই-বাছাই। ওই দুটি খসড়া কমিটি কাটছাঁট করে একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা দিবেন হাইকমান্ড। খসড়া কমিটিতে ঘোষিত আংশিক কমিটির সাধারণ সম্পাদকের মাধ্যমে স্থানীয় এমপি শামীম ওসমান নিজের পছন্দের লোকদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। অন্যদিকে সভাপতি ও সহসভাপতিও নিজেদের পছন্দের লোকদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, খসড়া কমিটিতে নিজস্ব পছন্দের লোকদের অন্তভূক্তির প্রতিযোগিতার কারণে সাংগঠনিক দক্ষতা ও যোগ্যতা থাকার পরও বাদ পড়েছেন অনেকে।
জেলা আওয়ামী লীগের ঘোষিত আংশিক কমিটির সভাপতি আবদুল হাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, পূর্ণাঙ্গ কমিটি কবে হবে সেটা কেন্দ্র বলতে পারবে। আমরা খসড়া কমিটি জমা দিয়েছি। যাচাই-বাছাই শেষে সেখান থেকেই ঘোষণা আসবে পূর্ণাঙ্গ কমিটির। কমিটি না হওয়ার পেছনে নিজেদের মধ্যে কোনো বিভেদ কাজ করছে কীনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সম্পাদকের সঙ্গে সমন্বয় রেখেই চলছি। কোনো বিভেদ নেই। সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত মো. শহীদ বাদলের দুটি মোবাইল নাম্বারে একাধিকার বার ফোন দিয়ে তা বন্ধ পাওয়া যায়। তাই তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
ওদিকে ১৯ বছর পর জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ ৩ পদের নাম ঘোষিত হলেও গত ১৪ বছরই জেলা আওয়ামী লীগের আহবায়ক কমিটি ছিল। এরমধ্যে আবার গত ৫ বছর আহবায়ক কমিটির আহ্বায়কও ছিল না। ২০১১ সালের ৩০ অক্টোবর নাসিক নির্বাচনের ঠিক পরদিনই জেলা কমিটির আহ্বায়কের পদ থেকে পদত্যাগ করেন সাবেক সংসদ সদস্য এস এম আকরাম। ২০১৪ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারি মারা যান কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক এবং ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক মফিজুল ইসলাম। এরপর থেকেই জেলা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বশূন্য।
দলীয় সূত্রমতে, ১৯৯৭ সালের ২০শে ডিসেম্বর শহরের শহীদ জিয়া হলে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সর্বশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ওই সম্মেলনে বিনা প্রতিদ্ধন্ধিতায় অধ্যাপিকা নাজমা রহমান সভানেত্রী ও শামীম ওসমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোট সরকার গঠন করলে শামীম ওসমান দেশান্তরি হন। রাজনীতিতে নিষ্কিয় হয়ে পড়েন নাজমা রহমান। পরে ২০০২ সালের ২৫শে মার্চ নাজমা রহমান ও শামীম ওসমানকে বাদ দিয়ে ৬১ সদস্য বিশিষ্ট খসড়া আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। পরে অবশ্য কয়েকজনের বিরোধীতা ও আপত্তির কারণে নাজমা রহমান ও শামীম ওসমানকে অন্তভুূক্ত করে ২৭ মার্চ ঢাকার পান্থপথ সোহাগ কমিউনিটি সেন্টারে ৬৩ সদস্য বিশিষ্ট নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের আহবায়ক কমিটি গঠন করে দেয়া হয়। সাবেক এমপি এসএম আকরামকে আহ্বায়ক ও মফিজুল ইসলামকে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়। কথা ছিল আহ্বায়ক কমিটি ৩ মাসের মধ্যে সম্মেলন করে একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করবে। কিন্তু বেশ কয়েকবার সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা করেও শেষ পর্যন্ত কোন্দলের কারণে আর সম্মেলন হয়নি। সংগৃহিত

