বিজয় বার্তা ২৪ ডট কম
মাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের নারায়ণগঞ্জ জেলার উদ্যোগে শ্রমজীবীদের মর্যাদা, ন্যায্য মজুরি ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ ও রূপরেখা এবং শ্রমিক সংগঠনসমূহের করনীয় শীর্ষক মতবিনিময়সভা আজ বিকাল ৫ টায় আলী আহম্মদ চুনকা পাঠাগার ও মিলনায়তন পরীক্ষণ হলে অনুষ্ঠিত হয়। অসুস্থ থাকায় মতবিনিময়সভায় শ্রম সংস্কার কমিশন প্রধান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মেদ অনলাইনে সরাসরি বক্তব্য রাখেন। মতবিনিময়সভায় বক্তব্য রাখেন শ্রম সংস্কার কমিশনের সদস্য ও সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্ট কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) এর অন্যতম শীর্ষ নেতা রাজেকুজ্জামান রতন, শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ-স্কপের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সমন্বয়ক আব্দুল কাদের হাওলাদার। সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্ট নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি আবু নাঈম খান বিপ্লবের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক সেলিম মাহমুদের সঞ্চালনায় জেলার নেতৃবৃন্দের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি হাফিজুল ইসলাম, জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশন নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি হাফিজুর রহমান, গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপ্রধান অঞ্জন দাস, গার্মেন্টস শ্রমিক টিইউসি নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি দুলাল সাহা, জাতীয় শ্রমিক জোট বাংলাদেশ নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি সৈয়দ হোসেন, বাংলাদেশের জাতীয় শ্রমিক জোট জেলার সংগঠক সোলেমান দেওয়ান, গার্মেন্টস ও সোয়েটার ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের জেলার সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন, রি-রোলিং স্টিল মিলস শ্রমিক ফ্রন্ট জেলার সাধারণ সম্পাদক এসএম কাদির।
সৈয়দ সুলতানউদ্দিন আহম্মদ বলেন, দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে শ্রমিক কৃষকের কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। দেশের জিডিপি বলি আর রপ্তানি আয় বলি সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শ্রমজীবী মানুষের শ্রম। কিন্তু সাত কোটি চল্লিশ লাখ শ্রমিকের বাংলাদেশে অর্থনীতির আলোচনায় বিনিয়োগ, রপ্তানি, উন্নয়ন সংক্রান্ত বিষয় যতটা গুরুত্ব পায়, শ্রমিকের জীবন জীবিকা ও নিরাপত্তার বিষয়গুলো ততটাই আড়ালে থেকে যায়। শ্রমের পরিবেশ ততটা মনোযোগ পায় না। অথচ টেকসই অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমজীবী মানুষের যথাযথ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মস্থল, সংগঠিত হওয়ার অধিকারসহ সব ধরনের আইনি স্বীকৃতি ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক।
তিনি আরও বলেন, অভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তবর্তী সরকার গত ১৮ নভেম্বর ‘শ্রম সংস্কার কমিশন’ গঠন করে। এই কমিশন বাংলাদেশের শ্রমখাতের সকল অংশের সাথে আলোচনা করে যে সুপারিশমালা প্রস্তুত করেছে তা গত ২১ এপ্রিল প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দিয়েছেন। শ্রম অধিকারবিষয়ক ২৫টি ক্ষেত্রে ৪৬০ পৃষ্ঠাজুড়ে যে সুপারিশগুলো তুলে ধরা হয়েছে, সেগুলো বাংলাদেশের শ্রমিকশ্রেণির অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে কাজ করবে। আগামী দিনের আন্দোলনে এবং দাবি উত্থাপনের ক্ষেত্রে এই সুপারিশগুলো যুক্তি এবং সাহস জোগাবে।
রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, শ্রম সংস্কার কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক, অপ্রাতিষ্ঠানিক, কৃষি, গৃহভিত্তিক, অভিবাসী, স্বনিয়োজিত শ্রমিকসহ সব শ্রমিকের জন্য রাষ্ট্র কর্তৃক শ্রম আইনের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, দেশের সব শ্রমিকের জন্য একটি সর্বজনীন জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ, মজুরি তিন বছর পরপর পুনর্নির্ধারণ, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মজুরি না দিলে শ্রমিককে ক্ষতিপূরণ, মূল্যস্ফীতির ভিত্তিতে বার্ষিক মজুরি বৃদ্ধি, আপৎকালীন তহবিল, নির্দিষ্ট মানদÐের ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ প্রদান, ট্রেড ইউনিয়ন করার বাধাসমূহ অপসারণ, স্থায়ী কাজে অস্থায়ী শ্রমিক বিশেষত আউটসোর্সিং ও দৈনিক মজুরি ভিত্তিক নিয়োগ বন্ধ, নারী শ্রমিকের মাতৃত্বকালীন ছুটির ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করে ছয় মাস, স্থায়ী শ্রম কমিশন প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি। দেশে বর্তমানে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের প্রায় সাড়ে সাত কোটি শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি এবং আইনি সুরক্ষা কিছুই নেই। সুপারিশে প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠানিক সব ক্ষেত্রে প্রত্যেক শ্রমিককে নিয়োগপত্র, পরিচয়পত্র বা প্রমাণপত্র দেওয়া বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে। কমিশনের সুপারিশ হলো লিভিং ওয়েজ বা জীবনী মজুরির ধারণাকে ভিত্তি হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে প্রতি তিন বছর পরপর জাতীয় ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। এরপর এই জাতীয় ন্যূনতম মজুরিকে ভিত্তি ধরে কাজের প্রকৃতি, খাতভিত্তিক চাহিদা, ঝুঁকি এবং অঞ্চলভেদে বিশেষ খাত ও পেশার জন্য পৃথক ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করতে হবে, যা কোনোভাবেই জাতীয় ন্যূনতম মজুরির কম হতে পারবে না। বর্তমান পদ্ধতিতে মজুরি বোর্ডের নামে মজুরি ঘোষণা হলেও শ্রমিকপক্ষের বিপরীতে শক্তিশালী মালিকগোষ্ঠীর ইচ্ছাতেই মজুরি নির্ধারিত হয়।এর অবসান করতে কমিশন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের জন্য একটি মানদÐ তৈরির সুপারিশ করেছে, যেখানে শ্রমিক পরিবারের মাসিক খাদ্য ব্যয়, খাদ্যবহির্ভূত ব্যয় (যেমন বাসস্থান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক ও বিনোদন) এবং ন্যূনতম মাসিক সঞ্চয় বিবেচনায় নিতে হবে। পরিবারের একক উপার্জনকারীকে বিবেচনায় নিয়ে এমন মজুরি নির্ধারণ করতে হবে যেন শ্রমিক তাঁর পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে পারেন।
তিনি বলেন, কমিশন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রতিটি সেক্টরের মজুরি সুপারিশ করার সময়ে মজুরির পরিমাণ নির্ধারণের ভিত্তি, মজুরির হিসাবপদ্ধতি ও মজুরির পরিমাণ নির্ধারণে ব্যবহৃত তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ করার সুপারিশ করেছে। মজুরি নির্ধারণে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো হিসেবে কমিশন শ্রম, অর্থনীতি ও মজুরি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, শ্রমিক ও মালিক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি স্থায়ী জাতীয় ন্যূনতম মজুরি কমিশন গঠনের কথা বলেছে। খাত ও পেশাভিত্তিক ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে স্থায়ী কমিশনের অধীন এক বা একাধিক কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। বার্ষিক মজুরি বৃদ্ধি বা ইনক্রিমেন্ট গড় মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে করার কথা বলেছে কমিশন। সময়মতো মজুরি না পেয়ে শ্রমিকদের রাস্তায় নামা একটি নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য কমিশন একটি বাধ্যতামূলক আপৎকালীন তহবিল গঠনের সুপারিশ করেছে। এই তহবিলে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান শ্রমিকদের দুই মাসের সমপরিমাণ মজুরি জমা রাখবে। তহবিলটি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, সরকার ও সংশ্লিষ্ট শিল্পের মালিকদের সংগঠনের যৌথ ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হবে।
রতন বলেন, স্বাধীনতার পর এই প্রথম গঠিত শ্রম কমিশন যে সুপারিশ দিয়েছে তার কি মুল্য থাকবে যদি তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া না হয়! অনেক ভালো কথা, ভালো আকাংখার অপমৃত্যু হতে দেখা গেছে বাংলাদেশে। এবারও সেটাই ঘটবে যদি শ্রমিকদের আন্দোলন না থাকে। তাই আহবান জানাই, আসুন শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলি।

