মামুনুর রহমান(মামুন), বিজয় বার্তা ২৪ ডট কম
কুটির শিল্প বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারক। এক সময় এদেশের কুটির শিল্পজাত পণ্য বিশ্বজুড়ে রপ্তানি করা হত। কিন্তু এসব এখন সোনালি অতীত। বিভিন্ন সমস্যার কারণে কুটির শিল্প আজ হুমকির মুখে। ঢাকার মসলিনের সুনাম ছিল বিশ্বব্যাপী। কিন্তু তা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। যদি এখনই কুটির শিল্প রক্ষাকল্পে উদ্যোগ গ্রহণ করা না হয় তাহলে মসলিনের মতো বাংলাদেশের সব কুটির শিল্প বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তবে সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে কুটির শিল্পের সাথে দেশ পৌঁছাবে উন্নতির শীর্ষে। বাংলাদেশ হবে সমৃদ্ধ, স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং আত্মনির্ভরশীল। জাতি ফিরে পাবে তার হারানো ঐতিহ্য ও গৌরব। বাংলাদেশে যেসব শিল্প সাধারণত স্বল্প মূলধন, সহজলভ্য কাঁচামাল ও অল্প সংখ্যক শ্রমিক দ্বারা নিতান্ত পারিবারিক পরিবেশে পরিচালিত হয় তাকে কুটির শিল্প বলে। এরূপ শিল্পের স্বল্প মূলধন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরিবারের সদস্যগণ সরবরাহ করে। এসব শিল্পে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয় না এবং উৎপাদন কলাকৌশল প্রাচীন আমলের। এ দেশের উল্লেখযোগ্য কুটির শিল্পগুলো হলো- হস্তচালিত তাঁত শিল্প, মৃৎ শিল্প, বাঁশ ও বেত শিল্প, বিড়ি শিল্প, কাসা ও পিতল শিল্প, শঙ্খ ও ঝিনুক শিল্প প্রভৃতি ।
এক সময় বাংলাদেশের কুটির শিল্পের সুনাম ছিল। কিন্তু নানা সমস্যার কারণে কুটির শিল্পগুলো টিকে থাকতে পারছে না। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশে এখনও বেশ কিছু সংখ্যক কুটির শিল্প আছে।
অন্যান্য কুটির শিল্প:শাড়ি, লুঙ্গি, মশারি, গামছা, কাতান ও জামদানি শাড়ি, রেশম থেকে শাড়ি, চাদর, থান কাপড়,পিতলের থালাবাসন, কলস, চামচ, ঘটিবাটি, ফুলদানি,হাড়ি, পাতিল, মূর্তি, খেলনা, কলস, ফুলদানি, টব, বাসন, সোফা সেট, ঝুড়ি, কুলা, মোড়া, পাটি, দোলনা, মাছ ধরার ঝুড়ি,কাঠের আসবাবপত্র, গৃহস্থালী সামগ্রী, লাঙ্গল, পুতুল, খেলনা, খাট ইত্যাদি কুটির শিল্প ।
কুটির শিল্পের বর্তমান অবস্থা: বর্তমানে বাংলাদেশে কুটির শিল্প হুমকির মুখে পড়েছে। আধুনিকতার প্রতিযোগিতায় এসব শিল্প আর টিকে থাকতে পারছে না। শিল্প আজ বিলুপ্তির পথে। দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমাদৃত নারায়ণগঞ্জের জামদানি শিল্পের অবস্থা একেবারেই নাজুক। বর্তমানে পর্যাপ্ত কাঁচামালের অভাব ও উৎপাদন ব্যয় বেশি হওয়ায় বেশির ভাগ কারিগরই তাদের আদি পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জ রুপগঞ্জের গ্রামগুলোতে এখন আর শোনা যায় না তাঁতযন্ত্রের সেই খটখটানি শব্দ। একদিকে সুতার মূল্য বৃদ্ধি ও দুষ্প্রাপ্যতা অন্যদিকে রপ্তানি বন্ধ ও উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়া এসব কারণে মুখ থুবড়ে পড়েছে নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী জামদানি শিল্প সহ বিভিন্ন কুটির শিল্প ।
হিন্দু সমাজের অধিকাংশ উৎসবই সৃষ্টি হয়েছে ধর্মীয় সংস্কৃতিতে পালনের অনুষঙ্গে | সারা বছরই বাঙালি হিন্দু নানা রকম উৎসব পালন করে | বাঙালি হিন্দুর প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা | আরো কয়েকটি প্রসিদ্ধ পূজা হলো – দুর্গাপূজা, কালীপূজা, সরস্বতী পূজা, শিবরাত্রি, দোলযাত্রা, রথযাত্রা, সত্যনারায়ণ পূজা, গণেশ চতুর্থী ইত্যাদি | পূজা পালনের দিক থেকে বাংলাদেশী হিন্দুদের সাথে অন্য দেশের হিন্দুদের কোনো পার্থক্য তেমন আছে বলে মনে হয় না তবে ঘরের বা মন্দিরের পূর্ণাঙ্গ পূজায় একাধিক উপচার বা পূজাদ্রব্য দেবতাকে উৎসর্গ করার প্রথা রয়েছে যা অঞ্চল, সম্প্রদায় বা সময় ভেদে ভিন্ন ভিন্ন হয় | এই সব উৎসবে দলিত জনগোষ্ঠীসহ সকলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে ।
নারায়ণগঞ্জ মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বাবু শিখণ সরকার শিপন জানান, নারায়ণগঞ্জ একটি ঐতিহ্যবাহী জেলা । অম্প্রাদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী। স্বাধীনতা যুদ্ধের পূর্বে থেকেই এই জেলায় দলিত জনগোষ্টী বসবাস করছে । বাংলার ঐতিহ্যবাহী শাড়ি কাপড় তাঁতের শাড়ি , বাঁশ, বেত, চামড়া, কাঠ ও মাটির তৈরি জিনিসপত্র তৈরি করে বাঙালী সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। দলিত জনগোষ্টীর তৈরি ঝুঁড়ি, কুলো, পালকি, দাঁড়ি পাল্লা, মাদুর, তাল পাখা, পাটা, ফুলদানি, টেবিল,ঢেঁকি, ধানের গোলা, ঢোল, ঢোলক, জুতা, চামড়ার ব্যাগসহ বিভিন্ন কুটির শিল্প তারা নিজহাতে কারুকাজ করে তা বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসব যেমন, পৌষ ও চৈত্র সংক্রান্তি সহ দোল উৎসব, কালীপুজা, শারদীয় দুর্গা পুজা, বর্ষবরণ ও বৈশাখী মেলা, গঙ্গাস্নান উপলক্ষে বারনি মেলা,নবান্ন উৎসব, ধর্মীয় যাত্রাপালা, রথযাত্রা, কৃষ্ণের জন্মাষ্টমী এসব অনুষ্ঠানে দলিতদের তৈরি বিভিন্ন পন্য বিক্রি হতো। কিন্তু দলিত জনগোষ্ঠীদের এই পন্য শুধুমাত্র সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসব গুলোতেই সীমাবদ্ধ থাকে । যদি সরকারি বা বেসরকারি ভাবে তাদের এই উৎপাদিত কুটির শিল্প কে আন্তর্জাতিক ভাবে প্রদর্শনী করা যায় । তাহলে সরকারের পাশাপাশি এই দলিত জনগোষ্ঠীরা ও উপকৃত হবে । শুধু তাই না বিপনন ব্যবস্থা জোরদারের মাধ্যমে প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় ওইসব পণ্য কেনা বেচার জন্য বাজার বা হাট সৃষ্টি করতে হবে। বিভিন্ন মেলায় স্টল দেওয়ার ক্ষেত্রে দলিত জনগোষ্টীকে সহজ শর্তে সূযোগ দিতে হবে। হাট, বাজার ও মেলায় দলিত জনগোষ্টীর উৎপাদিত কুটির শিল্পের ন্যয্য মূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। তিনি আরো জানান,ক্ষুদ্র ঋণের সুবিধা নিয়ে অনেক দরিদ্র জনগোষ্ঠী আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হলেও দলিত জনগোষ্ঠী সে সুবিধা থেকে অনেকটাই বঞ্চিত। বিশেষত তাদের জন্য সহজ শর্তে উপযুক্ত ঋণের ব্যবস্থা না থাকায় অনেকেই এখনো দারিদ্র্যের কবল থেকে মুক্ত হতে পারছে না। তাই মূল ধারায় সম্পৃক্ত করতে ভূমি সংক্রান্ত সমস্যার বিষয়টি সমাধানের পাশাপাশি সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত ও রাষ্ট্রীয়ভাবে বাজার ব্যবস্থাপনার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। দলিত জনগোষ্ঠীকে সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সেগুলো হলো- সহজ শর্তে ঋণের সুিবধা না থাকা, তাদের প্রচলিত পেশা ছেড়ে চাকুরি বা ব্যবসা না করার মনোভাব, অনুদানভিত্তিক সহায়তার কারণে ক্ষুদ্র ঋণে আগ্রহ না থাকা ইত্যাদি।
বাংলাদেশ দলিত ঋষি পঞ্চায়েত ফোরাম, নারায়নগঞ্জ জেলা কমিটি সাধারণ সম্পাদক শ্রী রিপন চন্দ্র দাস জানান, নারায়নগঞ্জ জেলার বিভিন্ন স্থানে যে সকল দলিত প্রান্তিক জনগোষ্ঠি রয়েছে তাদের বেশীর ভাগই বেতের আসবাপত্র, তৈজস্বপত্র সহ নানাহ বাহারি ঢালনা, চামড়া জাত শিল্প বিশেষ করে চামড়ার ব্যবসা , পুরাতন -নতুন জুতার ব্যবসা, পুরাতন জুতা মেরামত, বিভিন্ন ধরনের বাদ্যযন্ত্র মেরামত, নতুন-পুরাতন বাদ্যযন্ত্র ক্রয় বিক্রয়ও করে তারা যার যার জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। অতীতে এ সব ব্যবসা ও পেশায় বেশ উদ্বীবিত ছিল প্রান্তিক জনগোষ্ঠি। কিন্তু কালের প্রবাহমান গতিবিধির করুন পরিনতি আজ সেই বংশপরমপরায় পিতৃপুরুষের ঐতিহ্যবাহী ব্যবসা হারাতে বসেছে নারায়নগঞ্জ বাসী। সরকারের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা থাকলে পুনরায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠি নতুন করে আলোর মুখ দেখত। কিন্তু তারা সরকারের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত তাছাড়া যদি এ হতদরিদ্র জনগোষ্ঠির জন্য সরকারি ভাবে বিভিন্ন প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করা যেত তাহলে এ গোষ্ঠির ভাগ্য কিছুটা হলেও পরিবর্তন করা যেত। তাই সরকারি বিভিন্ন কুটিরশিল্প প্রকল্প আওতাধীন যদি এ হতদরিদ্র জনগোষ্ঠিকে বিভিন্ন হস্তশিল্প প্রশিক্ষন , সেলাই কাজ, নানাহ বেতের আসবাপত্র ও বাসনকোসন তৈরি করার জন্য প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করা হলেও তাদের জীবন যাত্রার মান উন্নয়ন করা সহজতর হতো। তার পাশিাপাশি বিভিন্ন উপবৃত্তি প্রদান সহ নানাহ কর্মপ্রশিক্ষনে এ জাতিকে অংশগ্রহনের মাধ্যমে একটি আত্মনির্ভরশী জাতিতে পরিবর্তন করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহন করা আবশ্যক। তিনি আরো জানান, বাঙ্গালী সকল ধর্মীয় উৎসবে দলিত জনগোষ্ঠীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে । বাঙালি হিন্দুর প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা | আরো কয়েকটি প্রসিদ্ধ পূজা হলো – দুর্গাপূজা, কালীপূজা, সরস্বতী পূজা এই উৎসব পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে দলিত জনগোষ্ঠীরা তাদের এই সংস্কৃতি পালন করতে পারে না । তাই এই উৎসব যদি সরকারি ও বেসরকারি ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা পায় তাহলে
এই দলিত জনগোষ্ঠীরা তাদের হারানো সংস্কৃতি পালন করতে পারবে ।
