বিজয় বার্তা ২৪ ডট কম
শহীদদের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা নিবেদন, কুচকাওয়াজ, মুক্তিযোদ্ধাদের মুখে যুদ্ধ চলাকালীন ঘটনার বর্ননা, মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা প্রদান, শিক্ষার্থীদের ডিসপ্লে প্রদর্শন, পুরস্কার বিতরণ ও দেশাত্মক বোধক সংঙ্গীতানুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বন্দরের সমরক্ষেত্র মাঠে উদযাপিত হয়েছে মহান স্বাধীনতা দিবস। এতে বন্দর উপজেলার মুক্তিযোদ্ধারা অংশ নিয়েছে বন্দর উপজেলার ২৩টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ২টি কলেজ, কিন্ডার গার্টেন ও মাদ্রাসা সহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী।
রোববার ২৬ মার্চ নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানের উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনায় এবং উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে রাষ্ট্রীয় এ অনুষ্ঠান কর্মসূচী পালন করা হয়। সকাল ৮টা থেকে শুরু হয়ে অনুষ্ঠান চলে দুপুর ২টা পর্যন্ত।
রোববার সকাল ৮টায় সহধর্মিনী মিসেস নাসরিন ওসমানকে সাথে নিয়ে বন্দর সমরক্ষেত্র মাঠে উপস্থিত হন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান। পরে তিনি সমরক্ষেত্র মাঠে অস্থায়ীভাবে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভে ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর একে একে বন্দর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, উপজেলা প্রশাসন, উপজেলা পুলিশ প্রশাসন, আওয়ামীলীগ, জাতীয় পার্টি সহ সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি সহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোর পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। পরে শান্তির প্রতীক পায়রা উঠিয়ে ও সালাম গ্রহণের মধ্য দিয়ে কুচকাওয়াজের উদ্বোধন করা হয়।
পরবর্তীতে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান মঞ্চে উঠে সমরক্ষেত্র মাঠে উপস্থিত বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা লাভের প্রকৃত ইতিহাস জানাতে ৩ জন মুক্তিযোদ্ধাকে মঞ্চে ডেকে তুলেন। যাদের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা সিদ্দিকুর রহমান, শাহেন শাহ, ও ফিরোজ আহম্মেদ তাদের যুদ্ধকালীন সময়ের ঘটনা গুলো বর্ননা করেন। কেন, কি কারণে এবং কার আহবানে তারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ে ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তাদের ভূমিকা, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সাথে তাদের যুদ্ধের ঘটনাবলীর বর্ননা করেন। যুদ্ধকালীন ঘটনার বর্ননা দিয়ে তারা বলেছেন বাংলাদেশে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময় যে সকল রাজাকার বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে ছিল তাদের মধ্য থেকে অনেকে এখনো প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদেরকে বিচারের আওতায় আনতে সরকারের প্রতি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে হৃদয়ে ধারণ করতে শিক্ষার্থীদের প্রতি আহবান রাখেন মুক্তিযোদ্ধারা। তাদের বক্তব্যের পর সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান নিজেও একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যুদ্ধ চলাকালীন সময় নিজের ভূমিকার কথা শিক্ষার্থীদের মাঝে তুলে ধরেন।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে মুক্তিযুদ্ধের ঘটনার বর্ননা দেওয়া ওই ৩ জন মুক্তিযোদ্ধার প্রত্যেককে একটি করে ফ্রিজ উপহার হিসেবে প্রদান করেন সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান। শুধু মুক্তিযোদ্ধারাই নয় বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতার ইতিহাস অকপটে তুলে ধরেন বন্দর গালর্স স্কুলের ৮ম শ্রেণীর শিক্ষার্থী মোনতাহা। ২৫ মার্চ গণহত্যা দিসব উপলক্ষ্যে বন্দর গালর্স স্কুলের একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে তার বক্তব্য শুনে ছিলেন বন্দর উপজেলার নির্বার্হী কর্মকর্তা(ইউএনও) মৌসুমী হাবিব। রোববার স্বাধীনতা দিবস উদযাপন মঞ্চে মোনতাহাকে আবারো বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ করে দেন ইউএনও মৌসুমী হাবিব। মোনতাহার মুখে বাংলাদেশের ইতিহাস এবং বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে বক্তব্য শুনে তাকে একটি ল্যাপটপ উপহার হিসেবে প্রদান করেন সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানের সহ ধর্মিনী মিসেস নাসরিন ওসমান।
এ সময় সেলিম ওসমান মঞ্চে মোনতাহা’র বাবা, মা এবং বড় বোন মঞ্চে ডেকে আনেন। মোনতাহার বক্তব্যে অভিভূত হয়ে সেলিম ওসমান বলেন, আজকে আমি নিজেকে একজন সার্থক মানুষ হিসেবে মনে করছি। আজকে মনে হচ্ছে আমি মরে গিয়েও শান্তি পাবো। আমি যে উদ্দেশ্য নিয়ে মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছি বাংলাদেশ সৃষ্টির সঠিক ইতিহাস এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে প্রতিষ্ঠিত করার আজকে মনে হচ্ছে তার প্রতিফলন ঘটতে শুরু করেছে। আজকে মোনতাহার মত একজন অষ্টম শ্রেনীর শিক্ষার্থী বাংলাদেশ এবং বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে যে ইতিহাস জানতে পেরেছে এটাই আমার সার্থকতা। আমি ভীষনভাবে আশাবাদী নারায়ণগঞ্জ এবং বন্দরের প্রতিটি ঘরে ঘরে এমন ভবিষ্যত প্রজন্ম গড়ে উঠবে। যারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে লালন করবে এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার অংশীদার হবে। এরআগে আমি ভাষা আন্দোলন, বঙ্গবন্ধুর জীবনী সম্পর্কে রচনা প্রতিযোগীতা, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে উপস্থিত বক্তব্যের আয়োজন করেছি ভবিষ্যতেও এ ধারা অব্যাহত থাকবে। প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধা ভাইয়েরা তাদের রণক্ষেত্রে ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলো যাতে ভবিষ্যত প্রজন্মকে বলতে পারে সেই আয়োজন করা হবে।
বন্দর সমরক্ষেত্র মাঠে ১৭, ২৩ এবং ২৬ মার্চ স্কুল শিক্ষার্থী এবং মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে এমন বিশাল অনুষ্ঠানের আয়োজন করায় বন্দর উপজেলার নির্বার্হী কর্মকর্তা মৌসুমী হাবিব সহ উপজেলা প্রশাসনের সকল কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানান সেলিম ওসমান। সেই সাথে প্রতিটি অনুষ্ঠানে দেশাত্মবোধক সঙ্গীত পরিবেশনের মাধ্যমে স্কুল শিক্ষার্থীদের দেশ প্রেমে উদ্ভুদ্ধ করায় ১৬জুন চাষাঢ়া আওয়ামীলীগ অফিসে বোমা হামলায় দুই পা হারিয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করা ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি চন্দন শীল এবং তার সাথে থাকা বাংলাদেশী আইডল খ্যাত বৃষ্টি, চ্যানেল আই ক্ষুদে গানরাজ খ্যাত বেলা, জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত টুসি ও সিমুর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন সেলিম ওসমান।
এছাড়াও রোববার স্বাধীনতা দিবস উদযাপন মঞ্চে সঙ্গীত পরিবেশন করে দর্শকদের আনন্দ দিয়েছেন বন্দর ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের এহসান উদ্দিন।
এরআগে মঞ্চে ডিসপ্লে পরিবেশন করেছেন, নাসিম ওসমান মডেল হাইস্কুল, শামসুজ্জোহা এমবি ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়, বিএম ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়, বন্দর গালর্স স্কুল এন্ড কলেজ, কদম রসুল ডিগ্রী কলেজ, বন্দর অটিজম চাইল্ড একাডেমী, হাজী সিরাজ উদ্দিন মেমোরিয়াল হাইস্কুল, বন্দর শিশু নিকেতন, পুরান বন্দর কিন্ডার গার্টেন সহ বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। পরে বিজয়ীদের মাঝে বিভিন্ন বিভাগে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয়স্থান অধিকারকারীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বন্দর উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আ.ক.ম নুরুল আমিন।
অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন, বন্দর থানা আওয়ামীলীগের সভাপতি এম এ রশিদ, জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি আবুল জাহের, যুগ্ম আহবায়ক আফজাল হোসেন, বন্দর উপজেলার চেয়ারম্যান আতাউর রহমান মুকুল, বন্দর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মৌসুমী হাবিব, বন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল কালাম, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর সাইফুদ্দিন আহম্মেদ দুলাল প্রধান, মুছাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাকসুদ হোসেন, বন্দর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এহসান উদ্দিন, কলাগাছিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন প্রধান, মদনপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এম এ সালাম, বন্দর উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার আব্দুল লতিফ সহ সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অসংখ্য নেতাকর্মী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।
