বিজয় বার্তা ২৪ ডট কম
পাসপোর্ট অফিসের বাইরে মাইকে প্রচার করা হচ্ছে ‘দালালমুক্ত সেবা’র বার্তা। অথচ ভেতরে বিশেষ সংকেত ও গোপন কোড ব্যবহার করে ফাইল দ্রুত অনুমোদন করানোর অভিযোগ উঠেছে। নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হলেও দালালদের মাধ্যমে আসা ফাইলগুলো অল্প সময়েই প্রক্রিয়াকরণের সুযোগ পাচ্ছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
অভিযোগ রয়েছে, অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বহিরাগত দালালদের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে একটি সিন্ডিকেট। এই চক্রের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ লাখ টাকার অবৈধ লেনদেন হচ্ছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। এমনকি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) যাচাইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক কাজও করানো হচ্ছে পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের দিয়ে।
সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েও সাধারণ আবেদনকারীদের অনেককে বারবার ফিরতে হচ্ছে। কখনো কাগজপত্রের ঘাটতি, কখনো অন্য কোনো অজুহাতে আটকে যাচ্ছে তাঁদের ফাইল। বিপরীতে, দালালদের মাধ্যমে আসা কিছু ফাইল বিশেষ সংকেত ও নির্দিষ্ট ই-মেইল ঠিকানার সূত্র ধরে দ্রুত অনুমোদনের জন্য পাঠানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
আবেদনের বিভিন্ন পাতায় ‘২০২০’, ‘Mos’, ‘R-119’ এবং ‘২৫২৬-০০০১৯৮০-জ’-এর মতো হাতে লেখা সংকেত ও কোড ব্যবহার করতে দেখা গেছে। এ ছাড়া কয়েকটি নির্দিষ্ট ই-মেইল ঠিকানার মাধ্যমে ফাইল চিহ্নিত করার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে উল্লেখ করা ই-মেইল ঠিকানাগুলো হলো—KUHINOORAKTER902S@GMAIL.COM, MDSHAMSULHAQ902S@GMAIL.COM, DEAMIN2006@GMAIL.COM এবং MHAITUNBIBI.MT-115@GMAIL.COM।
তবে এসব সংকেত ও ই-মেইল ঠিকানা ব্যবহারের উদ্দেশ্য এবং এর সঙ্গে কোনো অনিয়মের যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ থেকে ৮০০টি আবেদন জমা পড়ে। এর অর্ধেকেরও বেশি আবেদন দালালদের মাধ্যমে জমা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রতি ফাইলের বিপরীতে এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে। এ হিসাবে প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, সব মিলিয়ে এই লেনদেনের পরিমাণ দৈনিক প্রায় পাঁচ লাখ টাকা।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন পাসপোর্ট অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী। উপপরিচালক আবু নাঈম মাসুমের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে ঘুষের অর্থের বড় অংশ লেনদেন হয় বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
এ ছাড়া উপসহকারী পরিচালক মো. জাকির হোসেন, উচ্চমান সহকারী কামরুল হাসান এবং অফিস সহকারী মো. আল মামুন ও মো. সাখাওয়াত হোসেনের বিরুদ্ধে দালালদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে ও সরাসরি যোগাযোগ রেখে বিশেষ সংকেতযুক্ত ফাইলের অনুমোদন প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করার অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, অফিসের নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পরও বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিশেষ ফাইলের কাজ চলে। কখনো অফিসের ভেতরে, আবার কখনো সিসিটিভি ক্যামেরার নজর এড়িয়ে এসব কাজ করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
অনুসন্ধানের সময় অফিসের ৩০৫ নম্বর কক্ষে পরিচ্ছন্নতাকর্মী বাবুরুল ইসলাম বাবরকে কম্পিউটারে দাপ্তরিক কাজ করতে দেখা যায়। একইভাবে তৃতীয় তলায় নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যদেরও কম্পিউটারে কাজ করতে দেখা গেছে।
সোনারগাঁয়ের বাসিন্দা আকলিমা বেগম জানান, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে দুইবার লাইনে দাঁড়িয়েও তাঁকে ফিরে যেতে হয়েছে। প্রতিবারই কাগজপত্রে ঘাটতির কথা বলা হয়। পরে বাধ্য হয়ে বাইরের একটি কম্পিউটারের দোকানের সহায়তা নেন তিনি। এ সময় অতিরিক্ত তিন হাজার টাকা দেওয়ার পর একই কাগজপত্রে দ্রুত স্বাক্ষর হয়ে যায় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মাসদাইরের পোশাকশ্রমিক সাগর মিয়া বলেন, পাসপোর্টের ফাইল জমা দিতে তিনি সকাল সাতটায় অফিসে আসেন। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও কাজ সম্পন্ন করতে পারেননি। তাঁর অভিযোগ, নির্ধারিত সময়ে কর্মকর্তারা অফিসে উপস্থিত না থাকলেও কোডযুক্ত ফাইলগুলো সহজেই ভেতরে চলে যাচ্ছে।
পাসপোর্ট অফিসের আশপাশে বহিরাগতদের মাধ্যমে দালালি চলার অভিযোগও রয়েছে। ডাব বিক্রেতা নুরুসহ হাদী, রাজিব ও শাহজালাল নামের কয়েকজন ব্যক্তি প্রকাশ্যে দালালি করছেন বলে অভিযোগ করেছেন সেবাপ্রার্থীরা।
তাঁদের মাধ্যমে ফাইল জমা দিলে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করার আশ্বাস দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কম্পিউটারে বসে ফাইল যাচাইয়ের বিষয়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মী বাবুরুল ইসলাম বাবর বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশেই তিনি এ কাজ করছেন।
অন্যদিকে, নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপপরিচালক আবু নাঈম মাসুম অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, অফিসকে দালালমুক্ত রাখতে নিয়মিত মাইকিং করা হচ্ছে।
তবে লোকবল সংকটের কারণে পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে দিয়ে সাময়িকভাবে সহযোগিতা নেওয়ার বিষয়টি তিনি স্বীকার করেন। কিন্তু বিশেষ সংকেত ব্যবহার করে ফাইল অনুমোদন এবং ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক রায়হান কবির বলেন, পাসপোর্ট অফিসের দুর্নীতি প্রতিরোধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে দিয়ে দাপ্তরিক কাজ করানো অত্যন্ত দুঃখজনক।
তিনি আরও বলেন, দালালি এবং বিশেষ কোড ব্যবহারের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দ্রুত কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরকারি সেবা নিতে এসে সাধারণ মানুষকে কেন অতিরিক্ত অর্থ দিতে হবে, আর বিশেষ সংকেতের মাধ্যমে কারা ফাইল দ্রুত অনুমোদনের সুযোগ পাচ্ছেন—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

