বিজয় বার্তা ২৪ ডট কম
রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে দেয়া বেগম খালেদা জিয়ার বক্তব্যের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এলাকাটিতে মানুষের কোনো স্থায়ী বসতি ছিল না। কোনো বসতি উচ্ছেদ করা হয়নি। নিচু, পতিত জমি মাটিভরাট করে উঁচু করা হয়েছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য পশুর নদী থেকে লবণ পানি নিয়ে তা শোধন করে ব্যবহার করা হবে। ব্যবহৃত পানি শীতল করে পুনরায় বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহার করা হবে।
শনিবার বিকালে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গণভবনে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ভারতের সঙ্গে সাহস নিয়ে দ্বিপক্ষীয় বিষয় সমাধান করি। সমদ্রসীমা নির্ধারণে আমরা সাহসের সঙ্গে আন্তর্জাতিক আদালতে গিয়েছি এবং ন্যায্য অধিকার আদায় করেছি। বিএনপির সমালোচনা করে তিনি বলেন, বিএনপি প্রকাশ্যে ভারতবিরোধিতা করে অথচ তলে তলে স্বার্থ রক্ষা করে। তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, বিদ্যুৎ দিয়েছি বেশি আন্দোলন করলে সব বিদ্যুৎ বন্ধ করে দিবো।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির আসন্ন বাংলাদেশ সফর প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, আগে দেখি তিনি কি নিয়ে আলোচনা করেন- পরবর্তীতে সব জানানো হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোনো দূষিত বা গরম পানি পশুর নদীতে ফেলা হবে না। যে পরিমাণ পানি উত্তোলন করা হবে তা অত্যন্ত নগণ্য। শুষ্ক মওসুমে পশুর নদীর প্রবাহের মাত্র (০.০৫%) দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ অর্থাৎ ২ হাজার ভাগের এক ভাগ পানির প্রয়োজন হবে।
তিনি বলেন, এই পশুর নদীর নাব্যতা বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত ড্রেজিং করা হবে। ফলে পানি চলাচল বাড়বে। নাব্যতা বৃদ্ধি পেলে মংলা বন্দরে নৌযান চলাচল বৃদ্ধি পাবে। আয় অনেকগুণ বৃদ্ধি পাবে।
ভারতে বনাঞ্চলের ২৫ কিলোমিটার মধ্যে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের আইনী বাধা রয়েছে বলে বেগম খালেদা জিয়ার বক্তব্যে সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভারত একটি বিশাল আয়তনের দেশ। বাংলাদেশের মত ঘনবসতিপূর্ণ দেশের সাথে এর তুলনা সঠিক নয়।
তিনি বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশ আসে কয়লা থেকে। সেখানে সাত হাজারের বেশি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু আছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম নির্ধারিত হবে কয়লার দামের উপর ভিত্তি করে।
তিনি বলেন, ভারতের এনটিপিসি এবং বাংলাদেশের পিডিবি’র সমান অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ভারত মৈত্রী বিদ্যুৎ কোম্পানি গঠন করা হয়েছে। উভয় সংস্থা ১৫ শতাংশ বিনিয়োগ করবে। বাকী ৭০ শতাংশ দিবে ভারতের এক্সিম ব্যাংক। এই ৭০ শতাংশ অর্থায়নের ব্যাংক গ্যারান্টর থাকবে বাংলাদেশ। অজ্ঞাতবশতঃ কেউ কেউ এটাকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছেন। গ্যারান্টর হওয়া মানে তো বিনিয়োগ করা নয়। কোনো কারণে যদি কোম্পানি ব্যর্থ হয়, তখন ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন আসবে। সে রকম হওয়ার কোনো সম্ভবনা নেই। একটা ব্যক্তিগত লোন নিতে গেলেও তো গ্যারান্টর লাগে। আর স্থাপনা যেহেতু বাংলাদেশে, গ্যারান্টর হতে তো কোনো দোষ দেখি না। বাংলাদেশের স্থাপনায় ভারত কেন গ্যারান্টর হতে যাবে?
রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় সর্বোচ্চ মান বজায় রাখার জন্য বিশ্বের প্রথিতযশা ফার্ম জার্মানীর ফিশনার গ্রুপকে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কাজের মান নিয়ে কোনো প্রশ্নের অবকাশ নেই। এ বিষয়ে কোনো আপোষ করা হবে না।
তিনি বলেন, এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মিত হলে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল মানুষের চুরি করে গাছ কাটার প্রয়োজন হবে না। এলাকার লাখ লাখ মানুষ উপকৃত হবে। কোম্পানি থেকে বছরে ৩০ কোটি টাকা সিএসআর ফান্ডে জমা হবে। তা দিয়ে এলাকার জনগণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন কাজ করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী দেশে একশ্রেণীর মানুষ উন্নয়ন কাজ করতে গেলেই বাধা দেয় উল্লেখ করে এর সমালোচনা করে বলেন, রামপালে সুন্দরবনের কথা বলে বিরোধিতা করছে, আনোয়ারায় সুন্দরবন নেই। কিন্তু সেখানেও বিরোধিতা করছে কেন? এদের কথা শুনতে গেলে তো কোনো উন্নয়ন কাজেই হাতে নেয়া যাবে না।
তিনি বলেন, কয়লাভিত্তিক পাওয়ার প্লান্ট যদি এতই দূষণ সৃষ্টি করত, তাহলে জাপানের মত দেশ নতুন নতুন কয়লাভিত্তিক পাওয়ার প্লান্ট তৈরির উদ্যোগ নিত না। ক’দিন আগে জাপান সরকার ৭০০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক পাওয়ার প্লান্ট নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে। চীনে প্রায় ৩০০ কয়লাভিত্তিক পাওয়ার প্লান্ট নির্মাণ কাজ চলছে।
প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন রাখেন, এই যে শত শত মানুষ জড় করে রোডমার্চ করে, সমাবেশ করে, এগুলো করতে টাকা কে দেয়? পকেটের পয়সা থেকে কেউ নিশ্চয়ই খরচ করে না। এরা বাংলাদেশ বিরোধী শক্তির দাবার ঘুটি। তাদের এজেন্ট হয়ে কাজ করে। এসি-লাগানো বাড়িতে থেকে, এসি গাড়িতে ঘুরে মানুষকে হয়ত সাময়িকভাবে বিভ্রান্ত করা যায়, কিন্তু মানুষ ঠিকই এসব মতলববাজদের এজেন্ডা বুঝতে পারে।
শেখ হাসিনা বলেন, যদি এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারণে সুন্দবনের সামান্যতম ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকত, তাহলে আমিই হতাম প্রথম ব্যক্তি যে এটা স্থাপনের বিরোধিতা করত।
প্রধানমন্ত্রী সুন্দরবন সংরক্ষণের তার সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আজকে যে সুন্দরবন দেখছি ১০০ বছর আগেও এর ব্যাপ্তি অনেক বড় ছিল। ছোট হতে হতে আজকে এ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। সুন্দরবন কি বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য এভাবে সঙ্কুচিত হয়েছে?
তিনি বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি বা দূষণ ভৌগলিকভাবে সীমাবদ্ধ নয়। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কোন কারণ সুদূর আমেরিকায় ঘটলে, তার প্রভাব আমাদের এখানেও পড়বে। তাহলে আমেরিকা, জাপান, চীন, ভারতকে বলুন, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ বন্ধ রাখতে।
তিনি বলেন, উপকূল এলাকায় সবুজবেস্টনী সৃষ্টি করা হয়েছে। নতুন জেগে উঠা চরে বৃক্ষ রোপণ করে সেগুলোর ভূমিক্ষয় রোধ করার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে আইন তৈরি, বাঘ সংরক্ষণে টাইগার অ্যাকশন প্লান গ্রহণসহ তার সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের ফলে দেশে বনভূমির পরিমাণ ২০০৫-০৬ সালের ৭-৮ শতাংশ হতে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৪-১৫ সালে ১৭.০৮ শতাংশ হয়েছে। পরিবশে সংরক্ষণে আধা ডজনের বেশি আইন করা হয়েছে এবং পরিবেশ ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণের জন্য সংবিধানে মৌলিক পরিবর্তন করে ১৫তম সংশোধনীতে ১৮ ক নামে একটি নতুন সংযোজন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, গঙ্গার পানি প্রত্যাহারের ফলে দেশের পশ্চিমাঞ্চল বিশেষ করে রাজশাহী, পাবনা, কুষ্টিয়ায় মরুকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। বিএনপি সরকার এ ব্যাপারে কিছুই করেনি। আমরা ১৯৯৬ সালে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানি চুক্তি সম্পাদন করে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করি। ফলে ঐ অঞ্চলে মরুকরণ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়েছে। আমরা গড়াই নদীতে ক্যাপিটাল ড্রেজিং শুরু করেছিলাম ২০০১ সালে। বিএনপি এসে তা বন্ধ করে দেয়। ২০০৯ সালে আবার তা শুরু করেছি।
তিনি বলেন, প্রযুক্তিকে আপনি অস্বীকার করতে পারেন না। আগে কলেরায়, কালাজ্বরে, গুটি বসন্তে হাজার হাজার মানুষ মারা যেত। মানুষের আবিষ্কৃত ওষুধে জীবনহানি বন্ধ হয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, যারা নিজেদের পরিবেশবাদী হিসেবে জাহির করেন, তাদের কাছে প্রশ্ন: পরিবেশ সংরক্ষণে একটা গাছ লাগিয়েছেন জীবনে? নিজের বিবেককে জিজ্ঞেস করুন, যা করছেন সেগুলো কি মানুষের মঙ্গল বয়ে আনবে? ভুল, মনগড়া, মিথ্যা তথ্য দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করবেন না। আপনারা যেসব তথ্য উপাত্ত উপস্থাপন করছেন, সেগুলো ৬০’র দশকের। বিশ্ব অনেক বদলে গেছে। প্রযুক্তির উন্নয়ন হয়েছে। এসব মান্ধাতা আমলের তথ্য দিয়ে জনগণকে ধোকা দেওয়ার চেষ্টা করবেন না।
তিনি বলেন, একটা নন-ইস্যুকে ইস্যু করে কেউ যদি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করতে চায়, তাহলে তা কঠোর হাতে দমন করতে আমরা পিছ পা হব না।
