বিজয় বার্তা ২৪ ডট কম
নারায়ণগঞ্জে পুলিশের অপারেশন হিট স্ট্রং-২৭ অভিযানে গুলশান হামলার মাস্টারমাইন্ড জঙ্গি তামিম চৌধুরীসহ (৩৮) দুই সহযোগীসহ নিহত হয়। এদিকে বাড়ির মালিকসহ ১০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে পুলিশ। পরে নারায়ণগঞ্জে আলামত সংগ্রহের প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ না থাকায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে জঙ্গীদের মরদেহ স্থানান্তর করা হয়।
তামিমের নিহত দুই সহযোগীরা হলো- মানিক (৩৫) ও ইকবাল (২৫)।মানিক ও ইকবালের নাম জানা গেলেও তাদের বিস্তারিত জানা যায়নি।
ময়মনসিং এর ত্রিশাল থেকে গ্রেফতার হওয়া সালাউদ্দিন কাদের নামে তামিমের অন্যতম সহযোগী জঙ্গির তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের সোয়াত টিম, পুলিশ সদর দফতরের এলআইসি শাখা ও নারায়ণগঞ্জ পুলিশ যৌথভাবে এ অভিযান চালায়।
শনিবার দিবাগত রাত আড়াইটা থেকে শহরের পাইকপাড়ার ‘বড় কবরস্থান’এর পাশের নুরুদ্দিন দেওয়ানের বাড়ির চতুর্পাশ ঘিরে রাখে আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা। পরে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ইউনিটের একটি দল তৃতীয় তলা অবরুদ্ধ করে রাখে। ওই বাড়ির তৃতীয় তলায় ভাড়া থাকতো জঙ্গিরা। আরেকটি দল বাড়ির মালিকের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হন, তিন তলায় কারা-কারা অবস্থান করছে। জঙ্গিরা অবস্থান করছেন, এমন তথ্য নিশ্চিত হওয়ার পর হ্যান্ড-মাইকের মাধ্যমে জঙ্গিদের আত্মসমর্পন করতে বলা হয়। কিন্তু জঙ্গিরা তাতে সাড়া না দিয়ে উল্টো গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এ অবস্থায় সকাল পৌনে ৯টার দিকে অপারেশন ‘হিট স্ট্রং ২৭’ পরিচালনা করা হয়। প্রায় ৪৫ মিনিটের রুদ্ধশ্বাস অভিযানে গুলশান হামলার মাস্টারমাইন্ড তামিম চৌধুরীসহ তার সহযোগী আরো দুই জঙ্গি নিহত হয়। অভিযানের সময় আইনশৃংখলা বাহিনী সদস্যদের লক্ষ্য করে জঙ্গিরা একের পর এক গ্রেনেড ছুড়ে। এ অভিযানে স্নাইপার রাইফেল ব্যবহার করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ঘটনাস্থলে পুলিশ ও র্যাবের অতিরিক্ত সদস্যদের মোতায়েন করা ছিল। তবে ‘হিট স্ট্রং-২৭’ শুরুর আগে জঙ্গিরা অভিযানের বিষয়টি টের পেয়ে তাদের সব আলামত, মোবাইল, ল্যাপটপ ও সব নথিপত্র পুড়িয়ে ফেলে। অভিযান শেষে ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল, একে-২২ রাইফেল, তিনটি গ্রেনেড ও দুটি দূরবীন পাওয়া গেছে। পুলিশের বোম ডিসপোজাল ইউনিট গ্রেনেডগুলি নিষ্ক্রিয় করে। কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ইউনিটের অতিরিক্ত উপ পুলিশ কমিশনার ও বোম ডিসপোজাল ইউনিটের প্রধান সানোয়ার হোসেন এর সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। এদিকে অভিযান শেষে ওই ভবন থেকে একজন নারীসহ ৫জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে পুলিশ। দুপুর ২টা ৪০ মিনিটে ডিবি পুলিশের সাদা একটি গাড়িতে করে তাদের নিয়ে যাওয়া হয়।
অন্যদিকে, সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে নিহত তিন জঙ্গির মরদেহ নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে (ভিক্টোরিয়া) নেওয়া হয়। পরে মরদেহ থেকে আলামত সংগ্রহের প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ নারায়ণগঞ্জে না থাকায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
এ বিষয়ে ছানোয়ার জানান, আটকদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অভিযানের পরপরই সকাল ১১টার দিকে আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক ও সাড়ে ১২টার দিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
এদিকে গুলশান ও শোলাকিয়াসহ বিভিন্ন জঙ্গি হামলার মাস্টারমাইন্ড হিসেবে চিহ্নিত তামিম আহমেদ চৌধুরী পুলিশের আশঙ্কা থাকলেও নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত চেহারায় কোন পরিবর্তন আনেনি। এ পর্যন্ত গণমাধ্যমে পুলিশের পক্ষ থেকে তার মুখাবয়বের যেসব ছবি প্রকাশিত হয়েছে তাতে তার মুখে ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি দেখা গিয়েছিল। সেসময় পুলিশের পক্ষ থেকে আশঙ্কা করা হয়েছিল দাড়ি কেটে বা গোঁফ রেখে চেহারার পরিবর্তন এনে লুকিয়ে থাকতে পারে সে। তবে তামিম আত্মগোপনে থাকলেও নিজের চেহারায় কোনও পরিবর্তন আনেনি। তামিমের পরনে ছিল বেল্টসহ গ্যাভার্ডিন প্যান্ট ও নেভি ব্লু-টি-শার্ট। চেহারাতে বিশেষ কোনও পরিবর্তন দেখা যায়নি।
আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক ঘটনাস্থলে এসে সাংবাদিকদের বলেন, অভিযান শেষে ভিতরে গিয়ে দেখি, তিনজন জঙ্গি নিহত হয়েছে। তারমধ্যে তামিম চৌধুরীর যে ছবি আমাদের কাছে রয়েছে সেই ছবির সঙ্গে নিহত এক জঙ্গির ছবি হুবহু মিলে গেছে।
আইজিপি বলেন, গুলশান ও শোলাকিয়াসহ বিভিন্ন জঙ্গি হামলার মাস্টারমাইন্ড তামিম আহমেদ চৌধুরী বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডার নাগরিক। সিরিয়া থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে সে বাংলাদেশে আসে। তাকে ধরার জন্য কয়েকদিন আগে পুলিশ সদর দফতরে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ২০ লাখ টাকা পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়। পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটও তাদের ধরার জন্য কাজ করছিল।
আইজিপি আরও বলেন, গুলশান ও শোলাকিয়াসহ দেশে যতগুলো জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেছে তার সবগুলোই এই তামিম চৌধুরীর নেতৃত্বে জেএমবি ঘটিয়েছে। আমরা তামিম চৌধুরীকে খুঁজছিলাম। পরে গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে জানতে পারি তামিম চৌধুরী নারায়ণগঞ্জে অবস্থান করছে। সেই গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এ অভিযান চালিয়েছে। অপারেশনের আগে যা যা প্রস্তুতি নেওয়ার প্রয়োজন ছিলো সেগুলো সম্পন্ন করা হয়েছিল।
এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জঙ্গি দমনে সাহসিকতার পরিচয় রাখায় সোয়াট টিমের প্রশংসা করে বলেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এ ধরনের অভিযানে বরাবরই উল্লে¬খযোগ্য ভূমিকা রাখছে সোয়াট টিম। তারা এ ধরনের অভিযান চালিয়ে দেশকে রক্ষা করছে।
এ সময় তিনি প্রধানমন্ত্রীর কথা উল্লে¬খ করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী আপনাদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন। এই টিমকে তিনি পুরস্কৃত করবেন বলেও জানান তিনি।
নারায়ণগঞ্জে অপারেশন হিট স্ট্রং-২৭ এ জঙ্গি মাস্টারমাইন্ড তামিম চৌধুরীর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হলো বাংলাদেশে জঙ্গি কার্যক্রমের একটি কলঙ্কিত অধ্যায়ের। সাম্প্রতিক সকল জঙ্গি হামলার হোতা ছিলো তামিম চৌধুরী। স্বরাষ্টমন্ত্রী বলেন, গুলশান হামলার পেছনে ছিলেন তামিম চৌধুরী। ওই হামলার পরিকল্পনা তার, অর্থায়নও করেছিলেন। তিনি কানাডার নাগরিক। সারা পৃথিবীতে নাশকতা করে বেড়াচ্ছিলেন তিনি। তিনি জানান, আমাদের গোয়েন্দাদের কাছে খবর ছিল, তামিম চৌধুরী এ বাড়িটিতে আত্মগোপন করে আছেন। গোপন ওই সংবাদের ভিত্তিতে নিশ্চিত হয়ে রাত তিনটার দিকে বাড়িটি ঘেরাও করে রাখে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী।
কামাল বলেন, আমাদের গোয়েন্দা বাহিনী তৎপর, খোঁজ না নিয়ে, নিশ্চিত না হয়ে আমরা এগোই না। জঙ্গিদের বিষয়ে তিনি বলেন, এরা সংখ্যায় অল্প, জনবিচ্ছিন্ন। জনগণ এদের সমর্থন দেয় না। আমাদের গোয়েন্দারা কাজ করছেন। বাকি অল্প সংখ্যক যারা আছে, তাদেরকেও আমরা ধরে ফেলবো।
তিনি আরও বলেন, আমরা হুজুগে চলি না। আমরা সবকিছু তদন্তের ভিত্তিতে কাজ করে থাকি। আমরা যেটা বাস্তব সেটা নিয়েই কাজ করি। বাস্তবতা হলো জঙ্গিরা সংখ্যায় খুব অল্প। তারা জনবিচ্ছিন্ন। আমাদের জনগণ এদের কোনও আশ্রয় প্রশ্রয় দেয় না। বাকিদেরও আমরা দ্রুত ধরতে সক্ষম হবো।
তামিম চৌধুরীর মৃত্যুতে তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে কিনা, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জীবিত অবস্থায় থাকলে তারা তথ্য দেবে কিনা এই নিয়ে আমরা মাথা ঘামাচ্ছি না। আমাদের গোয়েন্দারা কাজ করছে। তাদের কাছে সঠিক তথ্য রয়েছে।
বাড়ির মালিক নুরুদ্দিন জানান, মুরাদ ও রানা পরিচয়ে জঙ্গিরা তার বাসাটি ভাড়া নিয়েছিল। তারা একমি নামে একটি ঔষধ কোম্পানীতে চাকুরি বলে জানায়। তাদের ভোটার আইডি কার্ডসহ পরিচয়ের বিস্তারিত ডকুমেন্ট চাইলে দিবে দিবে বলে ঘুরাচ্ছিল। তাদের দিনের চেয়ে রাতের যাতায়াত বেশি ছিল বিদায় তিনি তাদের বাসা ছাড়ার জন্য বলে দিয়েছিলেন। এর মধ্যেই এ ঘটনাটি ঘটে।
অভিযানে অংশ নেয়া এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জানান, তাৎক্ষণিকভাবে মানিকের পরিচয় বিস্তারিত জানা যায়নি। গত ঈদের আগে মানিক ওই বাসাটি ভাড়া নিয়েছিল। তার মাধ্যমেই ওই বাড়িতে ওঠে গুলশান হামলার মাস্টারমাইন্ড তামিম চৌধুরী।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, কল্যানপুর থেকে গ্রেফতার হওয়া রিগ্যানকে নিহত মানিক ও ইকবালের ছবি দেখানো হয়েছে। রিগ্যান তাদের পরিচয় নিশ্চিত করেছে। তিনি আরও জানান, কল্যানপুরের অভিযানের সময় ইকবাল একে-২২ রাইফেল নিয়ে পালিয়েছিল। শনিবারের অভিযানে ওই রাইফেলটি পাওয়া গেছে। ঘরের দরজার কাছে দুজনের লাশ পড়েছিল, তামিমের লাশ ছিল ঘরের ভেতরে। তামিমের কাছে গ্রেনেড এবং বাকি দুজনের একজনের কাছে এ কে-২২ রাইফেল এবং পিস্তল ছিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় মসজিদের খাদেম মাহমুদুল ইসলাম জানান, নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের সময় পাল্টা গ্রেনেড ছোড়ে সন্দেহভাজন জঙ্গিরা। সেসময় ‘আল্লাহু-আকবর’ বলে শ্লোগান দেয় তারা। শুক্রবার রাত আড়াইটা থেকে ওই বাড়ির আশেপাশের বাড়ি থেকে লোকজনকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং বাড়িটি ঘেরাও করে রাখা হয়। অপারেশন শুরুর পর বিস্ফোরণ ও গুলির শব্দ শোনা যায়।
পাইকপাড়া বড় মসজিদের খাদেম মাহমুদুল ইসলাম আরো বলেন, প্রতিদিনের মতোই নামাজের জন্য উঠি ঠিক সাড়ে তিনটায়। আনুমানিক ৪টার দিকে দেখি পুরো এলাকা পুলিশ ও র্যাব ঘিরে রেখেছে। পরে সকালে জানতে পারি দেওয়ান বাড়ির নুরুদ্দিনের বাসায় জঙ্গি রয়েছে, তাদের ধরতেই এ পুলিশি অভিযান।
তিনি বলেন, নুরুদ্দিন দেওয়ানকে এলাকায় সজ্জন ব্যক্তি হিসেবেই জানি। তিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজও পড়েন এখানে। তবে ঘটনার সকালে তিনি নামাজে আসেননি। এলাকায় এমন জঙ্গি রয়েছে তা আমরা জানতাম না।
উল্লেখ্য, গুলশান ও শোলাকিয়াসহ সাম্প্রতিক জঙ্গি হামলার মাস্টারমাইন্ড হিসেবে তামিম আহমেদ চৌধুরী ও সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়া মেজর সৈয়দ জিয়াউল হককে ধরিয়ে দিতে ২০ লাখ টাকা করে ৪০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। সেসময় পুলিশের পক্ষ থেকে তাদের আসল ছবিসহ তারা আত্মগোপনে গিয়ে সম্ভাব্য যেসব রূপ ধারণ করতে পারেন সে ধরনের আরও কয়েকটি ছবি প্রকাশ করা হয়।
এ সময় ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসেন, সরাষ্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, পুলিশ আইজিপি শহিদুল হক, অতিরিক্ত আইজিপি মো. নুরুজ্জামান, ঢাকা ডিএমপি অতিরিক্ত কমিশনার মো. মনিরুল ইসলাম, ঢাকা ডিএমপি অতিরিক্ত এডিশনাল এসপি ডিবি ছারোয়ার হোসেন,নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক আনিছুর রহমান মিঞা,নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মঈনুল হক, নারায়ণগঞ্জ র্যাব-১১ এর এসপি শিবলী সাদিক, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ( ডিএসবি ) মো. ফারুক হোসেন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) গাউছুল আযম, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাংসদ একেএম সেলিম ওসমান, নারায়ণগঞ্জের আসনের সাংসদ একেএম শামীম ওসমান, মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন, সহ সভাপতি মো. রবিউল হোসেন, মহানগর পূজা উদয্যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শিখন সরকার শিপন প্রমূখ।

