লেখক রনজিৎ মোদক, বিজয় বার্তা ২৪ ডট কম
শ্যামা কালী পূজা ও দীপাবলি সনাতন হিন্দুদের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব। কার্তিক মাসের দীপান্বিতা অমাবস্যায় পালিত হয়। এটি দীপাবলি দীপান্বিতা অমাবস্যায় পালিত হয়। এটি দীপাবলি, দীপান্বিতা, দীপালিকা, সুখরাত্রি, সুখসুপ্তিকা, যক্ষরাত্রি নামে ও অভিহিত। শ্যামা কালী গৃহে বা মন্ডপে মৃন্ময়ী প্রতিমা নির্মান করে পূজা করা হয়।
চামুন্ড্যাচর্চিকা কালীপুজা বাংলা ও বর্হিবঙ্গে প্রাচীন উৎসব হলেও কালীপূজা আধুনিক কালের ষোড়শ শতাব্দীতে নবদ্বীপের প্রসিদ্ধ স্মার্ত পন্ডিত তথা নব্যস্মৃতির ¯্রষ্টা রঘুনন্দন দীপান্বিতা অমাবস্যায় লক্ষী পূজার বিধান দিলেও কালী পূজার উল্লেখ্য করেনি। ১৭৬৮ সালে রচিত কাশীনাথের কালী সর্পযাস বিধি গ্রন্থে দীপান্বিতা অমাবস্যায় কালীপূজার বিধান পাওয়া যায়। সপ্তদশ শতকে নবদ্বীপের প্রথিতযশা তান্ত্রিক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশকে বাংলায় কালীমুর্তি ও কালী পুজার প্রবর্তক মনে করা হয়। অষ্ট্যদশ শতাব্দীতে নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় কালী পূজাকে জনপ্রিয় করে তোলেন। এই সময় রাম প্রসাদ সেন ও কালী মুর্তি গড়ে পুজা করতেন। উনবিংশ শতাব্দীতে কৃষ্ণচন্দ্রের পৌত্র ঈশানচন্দ্র ও বাংলার ধনী জমিদারদের পৃষ্ঠ পোষকতায় কালী পূজায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
শত শত বছর কালী পূজা ঘট স্থাপনের মাধ্যমে করা হতো। গবেষকদের ধারণা বাঙলায় মুর্তি গড়ে সেভাবে পুজার তেমন প্রচলন ছিলো না। সপ্তম শতকে ভদ্রবংশীয় মহাসামন্তদের হাত ধরে এ কালী পুজা শুরু হয়। স্বর্গীয় বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের আদি নিবাস ছিলো বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার উথালী গ্রাম এলাকায় কালী পূজার কিছু প্রাচীন নিদর্শন পাওয়া যায়।
শ্রী শ্রী দুর্গা মায়ের রুদ্রমুর্তি হচ্ছে কালী। মার্কেন্ডীয় পুরানে শু¤ু¢নিশুম্ভুকে বধ করার সময় মা দুর্গা কালী মুর্তি ধারণ করে রক্ত বীজের বংশ ধ্বংশ করেন। কালী শক্তিময়ী, কড়ালিনী, আবার তিনি দয়াময়ী বিশ^ জননী। কখনও ভয়ংকরী কখনও আনন্দময়ী, কৃপাময়ী। কালোহারিনী, শ্মশানবাসিনী, অনন্তময়ী। কালো রূপের আলো জে¦লে আলোর বন্যায় ভাষায় ধরণী কালী সৃষ্টি স্থিতিপ্রলয় কারী।
ঢাকার ঢাকেশ^রী, কলকাতার কালী, জামালপুরের দয়াময়ী, চট্টগ্রামের চট্টেশ^রী, নবদ্বীপের ভবতারিনী, কৈলাশের ভবানী, কামরূপের কামাক্ষা, দক্ষিনেরশ^রে রাম কৃষ্ণের কালী মা। রাম প্রসাদের কন্যারূপি বেড়াবাধূঁনী। শ্যামাকালী মায়ের প্রিয় ফুল রক্তজবা। শক্তিময়ীর সাধনা যারা করেন তাদের কঠিন ব্রত পালন করতে হয়। ছয় রিপু দশ ইন্দ্রিয় মায়ের চরণে নিবেদন করার বিধান রয়েছে। যারা কালী সাধক তারা এই ছয় রিপু এবং দশ ইন্দ্রিয়কে বলি দিয়ে থাকেন। মায়ের গলায় যে ষোলটি মুন্ড রয়েছে তা হচ্ছে সেই অসুর রূপী ছয় রিপু ও দশ ইন্দ্রিয়ের প্রতীক। মতান্তরে কালী দেবীর কোমরের হাতগুলো কর্মের তাৎপর্য তুলে ধরা। শ্মশানবাসী জীবনের শেষ পরিনতিকে নির্দেশ করে। মুন্ডগুলো জ্ঞানের ধারক শ্রী রাম কৃষ্ণদেব ছয় রিপু ও দাশ ইন্দ্রীয় মায়ের চরণে নিবেদন করেছেন। শ্রী চৈতন্ন দেব জীব উদ্ধ্যারে ষোল নাম মহামন্ত্র দান করেছেন। যেই কৃষ্ণ সেই কালী। শ্যাম শ্যামা এই তো শ্যামাকালী। দক্ষিনেশ^রে বেলুর মাঠে স্বামীজি দর্শন করেিেছলেন রামকৃষ্ণের কালী মা।
বাংলাদেশ, ভারত, নেপালে হিন্দু সনাতনী সম্প্রদায়ের মধ্যে শ্যামাকালী পুজা ও দীপাবলি উৎসব ঘিরে বিভিন্ন উৎসব পালন করে। তন্মধ্যে পিতৃতর্পন, আলোকদান, বিভিন্ন প্রকার দান, ধ্যান করে। গৃহে গৃহে মন্দিরে মন্দিরে আলোক প্রোজ্জ্বলন করে প্রার্থনা করেন। দীপাবলির এই দিনেই শ্রী রামচন্দ্র চৌদ্দ বছর নির্বাশনের পর অযোধ্যায় ফিরে আসেন। পরমপ্রিয় রাজাকে ফিরে পেয়ে অযোধ্যাবাসি ঘিয়ের প্রদীপ জেলে সাজিয়ে তোলেন তাদের রাজধানী অযোধ্যা নগরী।
জৈন মতে, ৫২৭ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে মহাবীর দীপাবলির দিনেই মোক্ষ বা নির্বাণ লাভ করে ছিলেন। ষোলশ উনিশ খ্রিষ্টাব্দে শিখদের ষষ্টগুরু হরগোবিন্দ ও ৫২ জন রাজপুত্র দীপাবলির দিন মুক্তি পায় বলে শিখরাও এই উৎসব পালন করে। আর্য্য সমাজ এই দিনে স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর মৃত্যুুদিন পালন করে। এছাড়াও এই দিনে গৃহে গৃহে, মন্দিরে মন্দিরে ও শ^শানে ধুপদীপ জেলে প্রায়্যত পুরুষের আত্মার শান্তি কামনা সহ সবার জন্য আর্শিবাদ প্রার্থনা করে। শাস্ত্র মতে এই দিন পিতৃপুরুষ তারা মর্ত ধাম ত্যাগ করে স্ব স্ব স্থানে গমন করেন। অমাবস্যার পূর্বাহ্নে ভূতচতুদর্শী তিথিতে সনাতনী হিন্দু পরিবার বাড়ির চৌদ্দটা এঁদো কোনায় চৌদ্দটা প্রদীপ জালিয়ে কালো মুছিয়ে আলোকিত করে তুলেন বাড়ির চারদিকে। কার্তিক অমাবশ্যায় উত্তর ভারতে ল²ী ও গনেশও পুজা করা হয়। ভারতের নবদ¦ীপ, আসাম প্রদেশে মানকাচর শ্যামাকালী পূজা বেশ আনন্দ উৎসব পালন করা হয়। শ্যামা পুজা ও দীপাবলি আলোর উৎসব বলে খ্যাত। অমঙ্গলকে বিতারনের প্রতীক দীপাবলি। ধুপের ধোয়ায় মনের মলিনতা দুর হোক, আলোকে উদ্ভাশিত হোক সবার অন্তর। প্রেম ও শ্রদ্ধা ভালোবাসায় পূর্ণ হোক এই বিশ^ পরিমন্ডল। উপনিষদের মহামন্ত্রে বলা হয়েছে, “অসতো মা সত্ গময়। তমসো মা জ্যোতির্গময়। মৃত্যোমা অমৃতং গময়।ওঁ শান্তি…. ওঁ শান্তি…. ওঁ শান্তি….” অর্থাৎ আমাকে অসৎ হতে সত্যে নিয়ে যাও। মৃত্যু হতে অমরত্বে নিয়ে যাও। সর্বত্র ছড়িয়ে পড়–ক শান্তির বার্তা- হরে কৃষ্ণ\

