বিজয় বার্তা ২৪ ডট কম
নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেছেন , আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতিকে বলতে চাই আপনি অনেক হত্যার বিচার করেছেন। আপনি সবখুনের হত্যা বিচার করছেন। নারায়ণগঞ্জের অনেক হত্যার বিচার করছেন। কিন্তু ত্বকী হত্যার বিচার এখনও করছেন না। কিন্তু কেন? কারা এর পেছনে দায়ি আপনি জানেন। তারা কি রাষ্ট্রের চেয়ে বড়? তারা কি এতই বড় আর এতই প্রয়োজনীয় যে ত্বকী হত্যার বিচার করা যাবে না।
সোমবার (৮ মার্চ) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে পাঁচ নম্বর খেয়াঘাট এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে সাংস্কৃতিক জোট আয়োজিত ত্বকী হত্যার বিচারের প্রতিবাদে আলোর ভাসান শীর্ষক আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন, সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের আহ্বায়ক ত্বকী বাবা রফিউর রাব্বি, নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি ভবানী শংকর রায়, সাধারণ সম্পাদক শাহিন মাহমুদসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতির সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
তিনি বলেন, ত্বকী হত্যার বিচার এখনও হয়তো হয়নি কোনো না কোনো কারণে। তার মানে এই নয় যে কোনো দিন হবে না। ত্বকী হত্যার বিচার হতেই হবে। ত্বকী আমাদের প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে দাড়িয়েছে ,ত্বকী আমাদের প্রতিবাদের ভাষা হয়ে দাড়িয়েছে। অন্যায় অবিচার-অত্যাচারের প্রতীক হয়ে দাড়িয়েছে। ত্বকী শুধু নারায়ণগঞ্জে সীমাবদ্ধ নয় বাংলাদেশে সর্বত্র আনাচে কানাচে ,একটি ছোট্ট বাচ্চাও ত্বকীর কথা বলতে পারে। বাংলা ভাষাভাষী বিশ্বের যেখানে বাঙালী আছে সেখানেই ত্বকী আজ বিরাজমান। ত্বকীর মধ্যে দিয়ে আমরা নিশ্চয়ই নারায়ণগঞ্জকে সন্ত্রাসমুক্ত করবো। হত্যাকারীদের বিচার করবোআল্লাহ হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশক্তিমান। উনি মানুষকে বাড়তে দেয় বাড়তে দেয় বাড়তে । একদিন নিশ্চয়ই এ বিচার বাড়তে বাড়তে টান দিবে ।
নারায়ণগঞ্জে আশিকসহ সকল হত্যাকান্ডের প্রসঙ্গে মেয়র আইভী বলেন, যতগুলো হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছে তার কোনোটির বিচার আমরা পাই নি। কেউই পায় নি। সাহস করে তো কেউ বলতেই পারেনি। থানা অব্দিও কেউ যেতে পারেন নি। আশিক যখন মারা গেল। তার পরিবারের খুব কষ্ট হয়েছে থানায় যেতে। কষ্ট হয়েছে একটি জিডি (সাধারণ ডায়েরী) করতে। সেই জিডি থেকে নামটাম বাদ দেয়া হয়েছে। কিন্তু বিচার আজও হয় নি। তখন প্রতিবাদ করার মত কেউ ছিল না। আমার মনে আছে সেইদিন আমি ডিসি অফিসের একটি মিটিংয়ে আশিক হত্যার বিষয়টা তুলেছিলাম।
টগবগে একটা ছেলেকে এভাবে হত্যা করা হল। এর আগে হত্যার প্রায় ১ মাস আগে আশিক আমার অফিসে ও বাড়িতে গিয়েছিলো। আমাকে বলেছিলো আজমেরী ওসমান আমাকে মেরে ফেলবে। আমাকে বাঁচতে দেবে না। তখন আমি ওকে বলেছিলাম তুমি যখন এতই সন্দেহ প্রকাশ করছো তাহলে দেশের বাইওে বা অন্যকোথাও চলে যায়। কিন্তু সে ছেলেটা যায় নি দেশেই ছিলো এবং তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিলো।
আমি যখন সেটা ডিসি অফিসের মিটিংয়ে বললাম তখন একজন সাংসদ বলেছিলেন এরকম দুই,চারটা হত্যাকান্ড হতেই পারে। এটা কোনো কথা নয়। তার প্রায় ৩-৪ বছর পর আমাদের আদরের সন্তান মেধাবী সন্তান তানভীর মোহাম্মদ ত্বকীকে আমাদের হারাতে হয়েছে। এরপর চঞ্চল,মিঠু,বুলু হত্যাসহ অসংখ্য হত্যা হয়েছে। ৭১’র পরেও এ শহরে অনেক হত্যা হয়েছে। কোনো হত্যার সঠিক বিচার হয়নি বলে খুনীরা এত দুঃসাহসী হয়ে উঠেছে। মিথ্যাচার তো করেই এমন মিথ্যা বলে এমন এভিড্যান্স দেখায় যেটা দূর থেকে নথিপত্র হাত নাড়িয়ে দেখায়। মনে হচ্ছে যে কি পন্ডিত তাদের পান্ডিত্য এ শহরের মানুষ এদেশের মানুষ কিছুই বুঝতে পারে না। তারা জানে না মানুষ তাদের কতটুকু ঘৃণা করে।
তিনি বলেন, দুটি ছবি মানুষের মুখে ভেসে ওঠে একটি ভালোবাসা ও আরেকটি ঘৃণা। কি পরিমাণ ঘৃণা ক্ষোভ নিয়ে মানুষ তাদের দিকে তাকিয়েছে তারা যদি তা জানতে পারতো। তাহলে বুঝতে পারতো মানুষ তাদের কি পরিমাণ ঘৃণা করে। অথচ এই ঘৃণাকে এই ক্ষোভকে ভয় দেখিয়ে মানুষকে ভীত করতে চায়। তারা নারায়ণগঞ্জ শহরকে ভীতুর শহরে পরিণত করতে চায়। একটু খেয়াল করে দেখবেন এই মার্চ মাস আসলেই তাদের যত চ্যালা চামচা সকলে মিলে এমন সব আলোচনা এমন সব নাটক ,এমন সব কথা শুরু করে ,জুজুর ভয় দেখানো শুরু করে যেন কোনো কিছুই করা যাবে না। তারা ভাবছে নারায়ণগঞ্জে থেকে যা খুশি তাই করবে। কিন্তু এ পর্যন্ত তারা কোনোটাই সঠিকভাবে করতে পারে না। ভবিষ্যতেও ইনশাআল্লাহ পারবে না।
আমাকে দাবিয়ে রাখা যাবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমি যখন দাড়াই তখন বিদ্যুৎ চলে এমনকি আমার বাড়িতেও সাক্ষাৎকার দেয়ার সময় কারেন্ট চলে যায়। তাই বলে কি তারা আমার আওয়াজ বন্ধ করে রাখতে পারবে? কখনই আওয়াজ বন্ধ করে রাখতে পারবে না। দাবিয়ে রাখা যাবে না। আজকে নারায়ণগঞ্জে তারা যেভাবে মিথ্যা কথা বলছে রাজাকারকে মুক্তিযোদ্ধা বানায় মুক্তিযোদ্ধাকে রাজাকার বানায়। যার যা ইচ্ছা করছে তাই করছে। প্রশাসন ছাড়া তারা জিরো। তারা রাস্তায় হাঁটতে পারে না প্রশাসন ছাড়া। প্রশাসনের ছত্র ছায়ায় বসে বসে ডিসি অফিসে এসপি অফিসে অথবা কোনো উপজেলায় গিয়ে তারা অনেক বড় বড় কথা বলে ‘ কলিজা খুলে নিবে , মুড়ির মত পিষিয়ে মারবে ,মুরগীকে খাওয়াবে মাছকে খাওয়াবে। কত কথা যে বলতে পারে। আবার ইদানীং বলতেছে। এত তাদের ক্ষমতা দেখেন কি দাপট ক্ষমতার।
বলে যে ইউনিফর্ম পড়া ব্যক্তিই ক্ষমতায় থাকতে পারে না। আবার ১২ হাত পড়া শাড়ি নারী কি ক্ষমতা রাখবে। তাহলে কি আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কি ১২ হাত শাড়ি পড়েন না। উনি কি এ ক্ষমতা চালাচ্ছেন না। উনি কি এ রাষ্ট্র চালাচ্ছেন না। উনি একবার না তিনবার ক্ষতায় এসেছেন। তার পৃষ্ঠপোষকতায় প্রধানমন্ত্রীর নাম বেঁচে নারায়ণগঞ্জ শহরে ক্ষমতায় দেখিয়ে চলছেন। নাম বেঁচা বন্ধ করেন, প্রশাসন নিয়ে চলা বন্ধ করেন। দেখেন আপনারা কোথায় যান। রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে কুলি,মজুর শ্রমিক আপনাদেরকে পিটিয়ে মারবে এই শহরে। আপনারা কি মারবেন। একের পর এক নাটক সাজাচ্ছেন। কখনও হিন্দু সম্পত্তি কখনও মসজিদের কথা । কখনও হকারদের মাঠে নামান। কখনও নিজেরা কারো পৃষ্টপোষকতায় তাদের মাঠে নামেন। এগুলো সবই একদিন শেষ হবে।
এ সময় তিনি নারায়ণগঞ্জে মডেল মসজিদের নির্মাণ প্রসঙ্গে বলেন, একটি বিচিত্র ব্যাপার সরকারের নারাণগঞ্জে মন্ডলপাড়ায় মুজিববর্ষ উপলক্ষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উপহার হিসেবে একটি মসজিদ নির্মাণ করা হচ্ছে। কিন্তু তা এখন বন্ধ করে রাখা হয়েছে। কারণ ডিসি সাহেব পিডব্লিউ ইঞ্জিনিয়ারকে বলেছেন আপনি কাজটি বন্ধ রাখুন। কারণ কি শামীম ওসমান মন্ডলপাড়াতে মসজিদ করতে দিবে না। কারণ সেখান দিয়ে আইভী জিআ গিয়েছে বলে। কি বিচিত্র হয়ে গেছে আমাদের নারায়ণগঞ্জের প্রশাসন। আমরা কেউ মনে হয় কথা বলি না। কথা বলুন। ত্বকী তো আমাদের কথা বলতে শিখিয়েছে। ত্বকী আমাদের সাহস দিয়ে গিয়েছে। ত্বকী আমাদের সন্তান হয়ে শিখিয়ে দিয়ে গেছে কিভাবে কথা বলতে হয়। কিভাবে বাঁচতে হবে কিভাবে অন্যায়ের কাছে মাথা নত করতে হবে না।
‘বিচারের উর্ধ্বে কেউ নন’ উল্লেখ করে মেয়র আইভী বলেন, নারায়ণগঞ্জের নাগরিক সমাজ আবারো কথা বলুন। তারা ভেবেছে আমরা পিছিয়ে গেছি। ত্বকী হত্যার বিচার যেহেতু আট বছরেও হয় নি তারা ভাবছে আর বিচার হবে না। খুনীরা আবার মসনদে বসে প্রশাসনের সহযোগীতা নিয়ে নারায়ণগঞ্জে যা খুশি তাই করতে দিচ্ছে। নিশ্চয়ই আমরা তা হতে দেব না। আমাদের সন্তানের বিচার চাইবো। একদিন এ বাংলার মাটিতে ত্বকী হত্যার বিচার হবে। পালাবো আমরা না পালাতে হবে আপনাকে, আপনার পরিবার, গোষ্ঠীকে । যারা হত্যা করেন, মানুষ মারেন, নির্যাতন-অত্যাচার করেন, মিথ্যাচার করেন,খুন করেন বড় বড় কথা বলেন। প্রশাসন ছেড়ে পুলিশ বাহিনী ছেড়ে বেরিয়ে আসুন রাস্তায় দেখি আপনার কত বড় সাহস দেখি আপনার কত বড় ক্ষমতা। এ হত্যাকান্ডের বিচার একদিন হবেই হবে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটা কথা বলতে চাই রাসেলের হত্যাকান্ডের বিচার আপনি যেভাবে করেছেন। ঠিক সেভাবেই ত্বকী হত্যার বিচারটাও করুন। আপনার কাছে সকলেই সমান । বিচারের উর্ধ্বে কেউ নন।

