‍“১মে শ্রমজীবী মানুষের রক্ত দিয়ে কেনা একটি ঐতিহাসিক দিবস”

0
শেয়ার করুনShare on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0Print this pageEmail this to someoneShare on Tumblr0

বিজয় বার্তা ২৪ ডট কম

১ মে শ্রমজীবী মানুষের রক্ত দিয়ে কেনা একটি ঐতিহাসিক দিবস। নির্যাতন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের সংগ্রাম আর অধিকার আদায়ের রক্তাক্ত গৌরবময় দিন। আজ থেকে ১৩২ বছর আগে ১৮৮৬ সালে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটে ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের আন্দোলনে জীবন দিয়েছিলেন আগস্ট, ¯পাইজ, এঞ্জেলস, ফিসারসহ আরও অনেকে। কিন্তু ন্যায্য দাবিতে গড়ে উঠা আন্দোলন হত্যা ও নির্যাতনের মাধ্যমে দমন করতে পারেনি তৎকালীন আমেরিকান সরকার পুঁজিপতি গোষ্ঠী। বরং এ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর দেশে দেশে। পরবর্তিতে ১৮৮৯ সালে ফ্রেডেরিক এঙ্গেলসের নেতৃত্বে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের প্যারিস কংগ্রেসে ১ মে আন্তর্জাতিক বিক্ষোভ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত হয়। ১৮৯০ সালের নিউইয়র্কে প্রথম মে দিবসের সমাবেশের প্রস্তাবে লেখা হয়, ৮ ঘণ্টা কর্ম দিবসের দাবি পূরণের সংগ্রাম আমরা চালিয়ে যাব কিন্তু কখনো ভুলবো না, আমাদের শেষ লক্ষ্য হল (পুঁজিবাদী) মজুরি ব্যবস্থার উচ্ছেদ সাধন। তারপর থেকেই ৮ ঘণ্টা কাজ, ন্যায্য মজুরি আর পুঁজিবাদ উচ্ছেদের সংগ্রাম এক সাথেই চলছে।

দীর্ঘদিনের নিপিড়ণ-নির্যাতন আর শোষণ থেকে মুক্তি পেতে বুকের রক্তে শ্রমিকরা আদায় করেছিলেন দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের অধিকার। শ্রমিকদের আত্মত্যাগের বিনিময়েই সেদিন মালিকরা স্বীকার করেছিলেন শ্রমিকরাও মানুষ। তারা যন্ত্র নয়, তাদেরও বিশ্রাম ও বিনোদনের অধিকার রয়েছে, রয়েছে প্রয়োজন ।

আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটের সে দিনের সেই শহীদদের আত্যাগকে স্মরণ করে সারাবিশ্বে মে দিবস পালন করা হয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস তথা মহান মে দিবস হিসাবে। পৃথিবীর সমস্ত শ্রমিকের জন্য, তাদের অধিকারের জন্য, তাদের সম্মানের জন্য পালিত হওয়া এটি একটি বিশেষ দিন।

গত ১৮ শতকে পৃথিবীর ইতিহাসে একটা বিশাল পরিবর্তন ঘটেছিল। তৎকালিন কৃষি ভিত্তিক সমাজে যান্ত্রিক সভ্যতার এত উন্নতি হয় যে, প্রকৃতি অনেকটাই মানুষের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। এর আগে পর্যন্ত মানুষ ছিল মূলত কৃষি নির্ভর, কৃষিজীবী। কিন্তু তখন থেকেই কার্যত মানুষ হয়ে উঠল যন্ত্রনির্ভর। মানুষ কৃষিসভ্যতা থেকে প্রবেশ করলো যন্ত্রসভ্যতায়। আর মানবসভ্যতার এই পরিবর্তনটিই শিল্পবিপ্লব নামে পরিচিত। গোটা ইউরোপ জুড়ে বিশাল বিশাল শ্রমঘন কল-কারখানা তৈরি হলো, আর সেসব কল-কারখানায় হাজার হাজার মানুষের কর্ম সংস্থানও হলো। এবং বিপত্তিটাও শুরু হলো এইখান থেকেই।

এক সময় কৃষির স্বাধীন শ্রমিকরা বন্ধ কল-কারখানায় ঘন্টার পর ঘন্টা অমানবিক পরিশ্রমে অতিষ্ট হয়ে উঠলেন। প্রচন্ড ঠান্ডা কিংবা প্রচন্ড গরমের মধ্যেই তাঁদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করতে হয়। কেননা কল-কারখানার মালিকরা অধিক মুনাফার লোভে লাভ কীভাবে আরও বাড়ানো যায়, সেই চেষ্টায় যারপর নেই মরিয়া। শ্রমিক বেশি সময় কাজ করলে, উৎপাদন যেমন বেশি হয়, লাভও তেমন বাড়ে। সুতরাং তারা শ্রমিকদের দিয়ে ইচ্ছেমতো খাটিয়ে নিতে লাগলো। দিনে ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা কাজ করাতে লাগলো। এতে অতিষ্ট হয়ে যেসব শ্রমিক প্রতিবাদ করতো তাদেরকে এমনকি পায়ে শিকল বেধে, কারখানার ভিতর আটকিয়ে রেখে শারিরিক ও মানসিক ভাবে বিভিন্ন প্রকার নির্যাতন করে অমানবিক ভাবে কাজ করতে বাধ্য করা হতো। তার উপর শ্রমিকদেরকে তারা পারিশ্রমিকও দিত খুবই সামান্য। ফলে শ্রমিকরা ক্রমান্বয়ে প্রতিবাদ মূখর হয়ে উঠতে থাকে। আর মালিকরাও বিদ্রোহী শ্রমিকদের উপর শুরু করে যারপর নেই অত্যাচার। কোন কোন কারখানাতে অবাধ্য শ্রমিকদের পিটিয়ে হাত পা বেধে ফেলে রাখা হতো দিনের পর দিন, এমনকি এই একই কারণে বহু শ্রমিককে গুম, গুপ্ত হত্যা, এমনকি খুন পর্যন্ত করা হয়েছে। সেদিনের সেই শ্রমিক বিদ্রোহে অকাতরে প্রাণ দিতে হয়েছে অসংখ্য শ্রমিককে। তাঁদের আন্দোলনের মূল দাবি ছিলো ৮ ঘন্টা শ্রম, ৮ ঘন্টা বিশ্রাম, ৮ ঘন্টা বিনোদন। একজন শ্রমিক দিনে সর্বোচ্চ আট ঘণ্টাই কাজ করবে, এর বেশি নয়। কিন্তু মালিকরা শ্রমিকদের এই ন্যায়সংগত দাবী  কেবল উপেক্ষাই করেনা বরং হত্যা, খুন, গুমসহ বিভিন্ন ষড়যন্ত্র চক্রান্তের পথ গ্রহন করে। আর যে কারণে উপায়ন্তর না দেখে শ্রমিকরা ১৮৮৬ সালের ১ মে ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে ধর্মঘট শুরু করে।

১ মে ১৮৮৬ সাল। শিকাগো শহর কেন্দ্র করে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ শ্রমিক মিশিগান এভিনিউতে মিছিলে যোগদানের প্রস্তুতি দেখেই তৎকালীন মার্কিন সরকার ও মালিকেরা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পরে। তারা শান্তি রক্ষার নামে পুলিশ বাহিনীকে লেলিয়ে দেয় শ্রমিকদের বিরুদ্ধে। কিন্তু শ্রমিকদের সেদিনের ধর্মঘট বড় ধরনের কোন দুর্ঘটনা ছাড়াই সাফল্যের সঙ্গেই পালিত হয়। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় এরপরে ৩ মে শ্রমিক ধর্মঘট আরও ব্যাপক আকার ধারণ করে। সেদিন তো ম্যাক করমিক নামের এক প্রতিষ্ঠানের ফসল কাটা শ্রমিকরা পুলিশের মোকাবিলা করেই শ্রমিক সমাবেশ করে। কিন্তু মূল সমাবেশ চলাকালিন সময়ে মালিক পক্ষের নির্দেশে পুলিশ বিনা উস্কানিতে নিরস্ত্র সাধারণ শ্রমিকদের উপর নির্বিচারে গুলি বর্ষণ করে, ফলে তৎক্ষনাত শিকাগোর পিচঢালা রাজপথ শত শত শ্রমিকের রক্তে রঞ্জিত হয়ে যায়, প্রায় ১০-১২ জন নিরীহ শ্রমিক রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে। এবং ঘটনা স্থলেই প্রাণ হারাণ ৬জন শ্রমিক। হাজার হাজার শ্রমিক হাত পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন, পরে যাদের অনেকেই বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু বরণ করেন অথবা বাকী জীবন পঙ্গুত্ববরণ করেছিলেন।

৩ মে পুলিশি তান্ডব ও হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে ৪ মে হে মার্কেট চত্ত্বরে শ্রমিক সমাবেশের আহবান করা হয়। আর এই সমাবেশেই ঘটে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কলঙ্কদায়ক অধ্যায়ের। সমাবেশ চলাকালিন সময়ে ধারণা করা হয় পুলিশদের কেউ বা মালিকপক্ষের কোনো গুপ্তচর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশবাহিনীর দিকে একটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। মালিকপক্ষের অনুগত পুলিশবাহিনী তো এরকমই একটা কিছুর জন্যই অপেক্ষা করছিল। ওরা এবার বেপরোয়া লাঠিচার্জ ও সমানে গুলি চালাতে থাকে। এই দিন শিকাগো শহরের হে মার্কেটের সামনে থেকে ৪ জন শ্রমিক নিহত হন, হাজার হাজার শ্রমিক আহত হন এবং পঙ্গুত্ব বরণ করেন।  গ্রেফতার করা হয় ১৬ জনকে। পরবর্তীতে ১৮৮৭ সালের ২১ জুন তাদের বিরুদ্ধে তথাকথিত বিচার শুরু হয়। বিচারের নামে এক  প্রহসনের মাধ্যমে ঐ বছরেরই ৯ অক্টোবর ঘোষিত হয় বিচারের রায়। তাতে আরও ৬ জনকে ফাঁসি দেয়া হয়। ৩ জনকে দেওয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদন্ড। এর ফল হয় আরও ভয়াবহ। পুরো বিশ্বের শ্রমিকরাই এবার ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে। শিকাগোর এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বব্যাপী। বিশ্বের সকল শ্রমিক শামিল হতে থাকে এই আন্দোলনে।

শ্রমিকদের এই দূর্বার আন্দোলনের সামনে অবশেষে নতজানু হতে বাধ্য হন কল-কারখানার মালিকগণদের। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শ্রমিকদের কিছু মৌলিক দাবি ও অধিকার স্বীকৃত হতে শুারু করে। ১৮৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবের শতবার্ষিকীতে প্যারিসে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ১৮৯০ সাল থেকে শিকাগো প্রতিবাদের বার্ষিকী আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন দেশে পালনের পস্তাব করেন রেমন্ড লাভিনে। উল্লেখ্য, ১৮৯১ সালের আন্তর্জাতিক দ্বিতীয় কংগ্রেসে এই পস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়। বিশ্বের প্রায় সব কটি দেশে শ্রমজীবী মানুষ মে মাসের ১ তারিখকে সরকারি ছুটির দিন হিসাবে পালনের দাবি জানায় এবং অনেক দেশে এটা কার্যকর করাও হয়। এবং এতে বিশ্বজুড়ে শ্রমিকদের দৈনিক কাজের সময় ৮ ঘণ্টা ও সপ্তাহে ১ দিন ছুটির বিধি রেখে তৈরি হলো প্রথম শ্রম আইন।

কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্যো দিয়ে গড়ে উঠা বাংলাদেশে ১৮৮৬ইং সালের মালিকদের সাথে শ্রমিক শোষন, নিপিড়ণ নির্যাতন করার ক্ষেত্রে ২০১৭ইং সালের মালিকদের মধ্যে যেন কোন পার্থক্য নেই। বিশেষ করে গার্মেন্টসসহ বহু ক্ষেত্রে এখনও ৮ কর্মঘন্টার যায়গায় ১২ঘন্টা এমন কি ১৪/১৬ ঘন্টা পর্যন্ত খাটানো হচ্ছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই ১ মে সরকারি ছুটি হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। কিন্তু শুধু সরকারি ছুটি হিসেবে পালন করলেই কী শ্রমিক দিবস পালন করা হয়ে যায়? এটা কি কেবলই আনুষ্ঠানিকতা? শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, ৮ কর্মঘণ্টা, ওভারটাইম-এর  দ্বিগুন মজুরি এসবই যদি না পায় শ্রমিক, তাহলে শ্রমিক দিবস পালন করে লাভটাই বা কী? স্বাধীনতার ৪৬ বছর পার হলেও আজ অবধি বাংলাদেশের অধিকাংশ কল-কারখানাতে ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় নাই, অধিকাংশ কল-কারখানার মালিকপক্ষ দেশের প্রচলিত শ্রম আইনের কোন প্রকার তোয়াক্কা না করে বরং কারখানার অভ্যন্তরে নিজেদের খেয়াল খুশি মতো আইন তৈরী করে সেই দাস যুগের মতোই শ্রমিক শোষন, নির্যাতন- নিপিড়ণ করছে। আর এ সব কিছুই তারা জায়েজ করতে পারছে বড়লোকদের এই রাষ্ট্র ও সরকার সমূহের সহযোগীতায়। আর তাই মজুরী দাসত্বের অবসান করার সংগ্রামের পাশাপাশি এই পুজিবাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থা উচ্ছেদের সংগ্রামকেও বেগবান করা ছাড়া শ্রমজীবী মানুষের সামনে আর কোন পথ খোলা নেই।

লেখক:
আবু হাসান টিপু
সাধারণ সম্পাদক,
বাংলাদেশ বিপ্লবী শ্রমিক সংহতি,
কেন্দ্রীয় কমিটি।
মোবাইল: ০১৭২৫-২৬১৬৭৩।

শেয়ার করুনShare on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0Print this pageEmail this to someoneShare on Tumblr0

Leave A Reply