অনার্স পড়ুয়া রিকশা চালক প্রশান্তের স্বপ্ন পূরনে এমপির সহযোগীতা কামনা

0
শেয়ার করুনShare on FacebookShare on Google+Tweet about this on TwitterShare on LinkedInPin on PinterestPrint this pageEmail this to someoneShare on Tumblr

বিশ্বজিত দাস:বিজয় বার্তা ২৪ ডট কম

সুদূর লালমনিরহাট থেকে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে নিজেকে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত করার লক্ষ্য নারায়ণগঞ্জের বন্দরে অলিগলিতে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রিকশা চালিয়ে লেখাপড়ার খরচ জোগাড় করছে প্রশান্ত বর্মন। লালমনিরহাট জেলার আদিতমারি থানাধীন দূর্গাপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ গোপদাহ প্রশন্ত বমর্নের গ্রামের বাড়ি। ২০১০ সালে এইচএসসি পাসের গ্রামের পরিচিত একজন প্রতিবেশীর হাত ধরে ওই বছরই নারায়ণগঞ্জে আসেন প্রশান্ত বর্মন।

পরে ২০১০ সালে অর্নাসে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে নারায়ণগঞ্জ কলেজে ভর্তি হয় প্রশান্ত। তার বাবা দিনেশ চন্দ্র বর্মন পেশায় একজন দিন মজুর, পাশাপাশি একজন কৃষক। দুই ভাই এবং এক বোন সহ মোট ৫ জনের সংসার প্রশান্ত বর্মনের। তার দরিদ্র বাবার পক্ষে তার লেখাপড়ার খরচ চালানো সম্ভব হয়নি। দরিদ্রতা থামিয়ে রাখতে পারেনি প্রশান্ত বর্মনের লেখাপড়ার উদ্যম । শুধু দারিদ্রতাই প্রশান্ত বর্মনের কাছে হার মেনেছে হিন্দু-মুসলিম ধর্মীয় ভেদাভেদও।

২০০৮ সালে লালমনিরহাটের নিজ গ্রামের মহিষটুলি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জিপিএ- ৩ দশমিক ৬৯ পেয়ে এসএসসি পাস করে প্রশান্ত। পরবর্তীতে কামরুনেচ্ছা ডিগ্রি কলেজ থেকে ২০১০ সালে জিপিএ- ২ দশমিক ৭০ গ্রেডে এইচএসসিতে উর্ত্তীণ হয় প্রশান্ত। একই বছর অর্নাসে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন নিয়ে চাচা সম্বোধনকারী প্রতিবেশী নুরুল হকের হাত ধরে নারায়ণগঞ্জের বন্দরে আসেন প্রশান্ত। চাচা সম্বোধনকারী নুরুল হক তখন বন্দর এলাকায় রিকশা চালিয়ে জীবন চালাতো। প্রশান্ত বর্মন একজন হিন্দু ধর্মবালম্বী হলেও গত ৭ বছর যাবত এই মুসলিম পরিবারটির সাথে বসবাস করে আসছে। একই ছাদের তলায় হিন্দু ও মুসলিম পরিবারের সদস্যরা যেন ধর্মীয় ভেদাভেদের উর্ধে উঠে মানবতাকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। প্রশান্তকে নিয়ে নুরুল হকের আর্থিক অবস্থাও তেমন ভাল ছিল না। তাই লেখাপড়ার পাশাপাশি প্রশান্ত কোন চাকরি না পেয়ে শেষে চাচা নুরুল হকের সহযোগীতায় নিজেও রিকশা চালানো শুরু করে। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা কোন কোন দিন রাত ১২টা পর্যন্ত রিকশা চালিয়ে যে উপার্জন হয় তা দিয়ে নিজের লেখাপড়া আর খাওয়া দাওয়ার খরচ চালিয়ে প্রতি সপ্তাহে ১ হাজার টাকা করে বাড়িতে পাঠিয়ে দরিদ্র বাবা মাকে সংসার চালাতে সহযোগীতা করে আসছেন।

ব্যাটারি চালিত অটো রিকশার জন্য প্রতিদিন রিকশার মালিককের কাছে ৩০০ টাকা জমা দিতে হয়। মালিকের জমা পরিশোধের পর তার প্রতিদিন গড়ে ২ থেকে ৩’শ টাকা রোজগার হয়। তাই দিয়ে তার গ্রামের বাড়িতে সপ্তাহে ১ হাজার টাকা করে মাসে ৪ হাজার আর পড়ালেখা ও খাওয়া দাওয়ার খরচ চালান প্রশান্ত বর্মন।

গত বুধবার রাতে প্রতিবেদক বন্দরে প্রশান্ত বর্মনের রিকশায় চড়ে বন্দর রাজবাড়ি শাহী মসজিদ এলাকা থেকে বন্দর খেয়াঘাটে আসে। এ সময়টুকুতে প্রতিবেদক নিজের মোবাইল ফোন থেকে অপর একজন ব্যক্তির সাথে কথা বলেন। শিক্ষিক রিকশা চালক প্রশান্ত মোবাইল ফোনের কথোপকথোন শুনে কিছুটা আন্দাজ করতে পারায় রিকশা ভাড়া দিয়ে নেমে যাওয়ার সময় সে এই প্রতিবেদকের কাছ থেকে ভিজিটিং কার্ড চায়। কিন্তু তার কাছে কোন ভিজিটিং কার্ড না থাকায় প্রশান্ত কোন  ভিজিটিং কার্ড দেওয়া সম্ভব হয়নি। কিন্তু ভিজিটিং কার্ড চাওয়ার কারণ জানতে চাওয়া হলে প্রশান্ত বর্মন এই প্রতিবেদককে জানায় তার একটি চাকরির প্রয়োজন। ফলে প্রতিবেদক তার কাছে জানতে চায় সে তো রিকশা চালিয়ে উপার্জন করছেই তাছাড়া কোন চাকরি করার তার পূর্বের অভিজ্ঞতা রয়েছে কিনা। জবাবে প্রশান্ত জানান চাকরি করার কোন অভিজ্ঞতা তার নাই কিন্তু চাকরি করার মত শিক্ষাগত যোগ্যতা তার রয়েছে। তখন সে এই প্রতিবেদককে জানায় প্রশান্ত নারায়ণগঞ্জ কলেজে রাষ্টবিজ্ঞান বিভাগে ৪র্র্র্থ বর্ষের পরীক্ষা ইতোমধ্যে শেষ করেছে। পরে প্রতিবেদক তার কাছ থেকে নাম ঠিকানা মোবাইল নাম্বার সংগ্রহে রাখে এবং পরদিন রাতে প্রশান্ত বর্মনের বাড়ি গিয়ে পৌছায়।

প্রশান্তের দেওয়া ঠিকানা মত পরদিন বৃহস্পতিবার তার বাড়িতে গিয়ে দেখায় যায় নিজের লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত প্রশান্ত বর্মন। ছোট দুটি ঘর নিয়ে স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে সেখানে বসবাস করে প্রশান্তকে আশ্রয় দেওয়া সেই নুরুল হক। যাকে প্রশান্ত তার জেঠা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। প্রশান্ত বর্মন একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী হলেও গত ৭ বছর যাবত মুসলিম পরিবার চাচা নুরুল হকের বাসায় বসবাস করছে। নুরুল হক চাচার হাত ধরেই সে রিকশা চালানোর পেশায় নেমেছে। তখন নুরুল হক নিজেও রিকশা চালাতো। কিন্তু বর্তমানে বয়স আর অসুস্থ্যতার কারণে রিকশা চালাতে পারেনা নুরুল হক। তবে রিকশা চালকদের নিয়ে একটি মজে চালিয়ে নুরুল হকের সংসার চলছে কোন রকমে। নিজের টানাটানি সংসারের মধ্য থেকেও গত ৭ বছর ধরে প্রশান্তকে নিজেদের সাথে থাকতে দেওয়ার বিনিময়ে তার কাছ থেকে একটি টাকাও নেয়নি নুরুল হক। প্রশান্ত নিজেই এ প্রতিবেদককে নুরুল হকের এ মহানুভবতার কথা জানান এবং তারা উভয়েই নিজেদের সম্পর্কে পরিচয় দেয় তারা একে অপরের আপন চাচা ভাতিজার থেকেও বেশি কিছু। তাদের এমন হৃদ্রতা যেন হার মানিয়েছে দারিদ্রের থাবা এবং ধর্মীয় ভেদাভেদকেও। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের সচিত্র যেন ওই পরিবারটিতে সম্পূর্ণ রূপে ফুটে উঠেছে।

প্রশান্তের কলেজের পড়ালেখা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, তিনি নারায়ণগঞ্জ কলেজের ২০১০-২০১১ শিক্ষাবর্ষের অর্নাস রাষ্টবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী। এতো দিনে তার অর্নাস সম্পূর্ন হয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও দিনভর রিকশা চালিয়ে দুপুরের খাবারের সময় এবং রাতে বাসায় ফিরে যে টুকু সময় পায় সেই টুকু সময়তেই শুধু সে তার লেখাপড়া করে। যার ফলে অন্য দশজন শিক্ষার্থীর মত পড়ালেখা করার পর্যাপ্ত সময় এবং সুযোগ সে পায় না। অর্থাভাবে কোন কোচিং করতে পারে না সে। তাই অর্নাস দ্বিতীয় বর্ষে ইংরেজি এবং ৩য় বর্ষে রাজনৈতিক অধ্যয়ন পরিচিতি বিষয়ে তার ফলাফল খারাপ হওয়ার পুণরায় তাকে ইনপ্রুভমেন্ট পরীক্ষা দিতে হচ্ছে।

তবে এখানেও তার বাধাঁ হয়ে দাড়িয়েছে অর্থাভাব। প্রশান্ত জানান, নারায়ণগঞ্জ কলেজে অর্নাস রাষ্টবিজ্ঞান শাখা প্রশান্ত বর্মনের রোল নং ৯৭৫৭১২৫, আর রেজিস্ট্রেশন নাম্বার- ১০১১১৮২২৭৯৮। দ্বিতীয় বর্ষ শেষে ৪র্থ বর্ষের পরীক্ষা দেওয়া পর্যন্ত কলেজে মোট তার ২৪ হাজার টাকা বকেয়া জমা হয়েছে। তারপক্ষে এই অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব না হওয়ায় তিনি কলেজ কর্তৃপক্ষের শরনাপন্ন হয়ে তার আর্থিক অবস্থার কথা তুলে ধরেন। তখন কলেজের উপাধক্ষ্য ফজলুল হক রুমন রেজা তার কাছ থেকে ৭ হাজার টাকা কলেজে জমা করিয়ে তাকে ৪র্থ বর্ষের পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ করে দেন। তবে বাকি ১৭ হাজার টাকা কলেজ কর্তৃপক্ষ তাকে মওকুফ করেছে নাকি বকেয়া টাকাটা স্থগিত রেখেছে যা পরবর্তীতে পরিশোধ করতে হবে তা সঠিক জানা নেই প্রশান্তের।

দারিদ্রতার সাথে যুদ্ধ করে রাতদিন ভর রিকশা চালিয়ে প্রশান্তের লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া এবং তার জীবনের লক্ষ্য সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে প্রশান্ত জানান, সে অর্নাস পাস করার পর মাস্টার্সও সম্পন্ন করতে চায়। তার জীবনে একটি লক্ষ্য রয়েছে। লেখাপড়া শেষ করে যে নিজেকে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োাজিত করবে। তবে তার স্বপ্ন পূরণে এখন সব থেকে বড় দেয়াল হয়ে দাড়িয়েছে তার দারিদ্রতা। রাতদিন রিকশা চালিয়ে ঠিকমত লেখাপড়া করার জন্য সময় তা পাওয়ায় তিনি ভালো ভাবে লেখাপড়া টুকু চালিয়ে যেতে পারছেন না। তাই তিনি একটি হন্নে হয়ে একটি চাকরির খোঁজ করছেন। যদি সেটা পিয়নের চাকরিও হয় তাতেও তার কোন আপত্তি নেই। অন্তত ৮ ঘণ্টা ডিউটি শেষে তার পড়ালেখার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাবে এবং সে মাষ্টার্স সম্পন্ন করতে পারবে।

নিজেকে একজন শিক্ষক হিসেবে দেখতে চাওয়ার কারণ সম্পর্কে তার কাছে জানতে চাওয়া হলে প্রশান্ত জানান, আমি নিজে পড়ালেখা করার জন্য যে কষ্ট করছি, রিকশা চালিয়ে নিজের লেখাপড়ার খরচ জোগাড় করছি এতে করে অসহায় দরিদ্র মানুষের লেখাপড়ার খরচ জোগানোর কষ্টটাও আমি অনুভব করতে পারি। আমি শিক্ষক হয়ে আমার মত যারা অর্থাভাবে লেখাপড়া করতে পারবে না বা নিজে কাজ করে তাদের লেখাপড়ার খরচ জোগাড় করতে হবে সেই সকল সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের আমার সাধ্যমত সহযোগীতা নিয়ে তাদের পাশে দাড়াঁনোর লক্ষ্যে আমি নিজেকে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত করতে চাই।

সব শেষে এ প্রতিবেদকের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানের প্রতি আবেদন রেখে প্রশান্ত বলেন, আমি এখানে থেকে শুনেছি এবং নিজেও দেখেছি উনি অসহায় মানুষদের জন্য দুহাত ভরে সাহায্য করেন। শীতে শীতবস্ত্র, ঈদে ঈদ সামগ্রীর প্যাকেট, এছাড়াও উনি নিজের অর্থায়নে অনেক গুলো স্কুল নির্মাণ করে যাচ্ছেন যেখানে অদূর ভবিষ্যতে হাজার হাজার শিক্ষার্থী পড়ালেখা করার সুযোগ পাবে। মাননীয় সংসদ সদস্য যদি আমাকে একটু সহযোগীতা করেন আমাকে একটি চাকরির ব্যবস্থা করে দেন তাহলে হয়তোবা আমার জীবনের লক্ষ্যে পৌছানোর পথ অনেকটা সহজ হবে। এছাড়া আমার বেশি কিছু চাওয়ার নাই।

শেয়ার করুনShare on FacebookShare on Google+Tweet about this on TwitterShare on LinkedInPin on PinterestPrint this pageEmail this to someoneShare on Tumblr

Leave A Reply